নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ আগামীদিনের চ্যালেঞ্জ  

    এনার্জিনিউজবিডি ডটকম
    প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০১৯ রবিবার ০৩:৩১ পিএম BdST     ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রায় সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে সরকার। এখন নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ দিতে কাজ করে যাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বিদ্যুৎ বিভাগের টেকনিক্যাল উইং পাওয়ার সেল সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করছে। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কিভাবে বিদ্যুৎ খাত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে বিষয়ে এনার্জিনিউজবিডি ডটকমকে বলেছেন পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন

 

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: নতুন সরকারের সামনে বিদ্যুৎ খাতে আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো কি?

মোহাম্মদ হোসাইন: বিদ্যুৎ খাতের রূপকল্প অনুযায়ী তিনটি মূল শব্দ আছে তাহলো সব মানুষের কাছে বিদ্যুৎ সেবা পৌঁছানো এবং তা হবে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী। ইতোমধ্যে প্রায় সব গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর সক্ষমতা অর্জন করেছি। আমাদের হাতে এখন দুইটা চ্যালেঞ্জ একটা হলো সকল মানুষকে কিভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায় এবং সেটা সাশ্রয়ী মূল্যে কিভাবে দেওয়া যায়। এটাই হবে আগামীদিনের মূল চ্যালেঞ্জ এবং এই দুটো বিষয়কে মাথায় রেখে আগামী দিনের পরিকল্পনা, অ্যাকশন প্লান এবং রোডম্যাপ তৈরি করা হবে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: পাওয়ার সেল বিদ্যুৎ খাতের নীতি নির্ধারণীতে সহায়তাকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। এখন কি কি কাজ চলমান আছে?

মোহাম্মদ হোসাইন: পাওয়ার সেল বিদ্যুৎ বিভাগের টেকনিক্যাল উইং। আসলে আমাদের কাজের কোনো একক  পরিধি নেই। যখন যে টেকনিক্যাল সহযোগিতা লাগে আমরা বিদ্যুৎ বিভাগকে সহায়তা করে থাকি। ১৯৯৬ সালে যখন ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্লান্ট (আইপিপি)পলিসি চালু হয় তখন যে ডকুমেন্ট যেমন পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (পিপিএ)এবং ইমপ্লিমেনটেশন এগ্রিমেন্ট (আইএ) ছিলো অর্থাৎ ২০ বছর আগের আইপিপির জন্য যে ডকুমেন্ট করা হয়েছিলো এখনো সেটি চলছে বর্তমান সময়ের জন্য এটি কতটুকু যুগোপুযোগী তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এতে কিছু পরিবর্তন হয়েছে সেগুলো যৌক্তিকভাবে হয়েছে কিনা। না হলে এটাকে যৌক্তিককরণ করা হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ক্ষেত্রে গ্রিড স্ট্যাবিলিটি একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। গ্রিড স্ট্যাবল রাখার জন্য আইপিপিগুলোর কি দায়িত্ব থাকবে সে বিষয়টি ওই ডকুমেন্টে আনা হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অনেকগুলো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে কিন্তু সেগুলো উৎপাদনে আসছে না। শুধু বৃহৎ আকারে কক্সবাজারে ২০ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্প উৎপাদনে এসেছে। এ খাতে সমস্যাগুলো কোথায় তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে মডেল ডকুমেন্ট নিয়ে আইপিপি শুরু হয়। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে তা হয়নি। আইপিপির ডকুমেন্টগুলোকে কাট-পেস্ট করে নিজেদের মতো বানিয়েছি। ওই ডকুমেন্টগুলো যদি প্রফেশনাল ডকুমেন্ট হিসেবে তৈরি করা হতো তাহলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আরো প্রকল্প উৎপাদনে আসতো। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের পিপিএ এবং আইএ কেমন হওয়া উচিত সেগুলো আমরা প্রণয়ন করছি।

গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের ডিমান্ড দাঁড়াচ্ছে ১২,০০০ মেগাওয়াট অথচ শীতকালে ডিমান্ড নামতে নামতে ৩,০০০-৪০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ হলো আমাদের বেইজ ডিমান্ড যেটা সেটা খুবই কম। তার মানে ২৪ ঘন্টা যে ডিমান্ড সেটা খুবই কম। ইন্ডাস্ট্রি ছুটির দিন বন্ধ থাকবে অথবা সকালে চলবে বিকালে বন্ধ থাকবে এ রকম নয়। এটা চলে রাউন্ড দ্য ক্লক। এটাই হলো বেইজ ডিমান্ড। আসলে আমাদের সিস্টেমটা ভারসাম্যহীন। এটাকে ভারসাম্য অবস্থায় না আনতে পারলে গ্রিডকে বাঁচানো যাবে না অথবা সিস্টেমকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় আনা যাবে না। আমরা একটা স্টাডি করছি বর্তমানে যেসব ইন্ডাস্ট্রি ক্যাপটিভ পাওয়ার দিয়ে চলছে তাদেরকে কিভাবে গ্রিডে আনা যায়। তারা যদি দেখে এখন গ্রিডের বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন এবং বিদ্যুতের দামও কম তাহলে তারা আসবে। এজন্য গাজীপুরের কোণাবাড়ি শিল্প এলাকায় একটি পাইলট প্রকল্প করতে যাচ্ছি। সেখানে যদি তাদেরকে দেখাতে পারি গ্রিড এখন আর আগের মতো নেই। সেক্ষেত্রে নতুন শিল্প কারখানা যারা করছে তারা ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের অপশন আর রাখবে না। আর পুরানো যারা তারা গ্রিডের সংযোগ নেবে। তখন শীতকালে ডিমান্ড আবার জাম্প করে ৬,০০০-৭,০০০ মেগাওয়াটে উঠবে। আমরা কিছু ইন্সটিটিউশনাল কাজও করছি। কয়েক বছর আগেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ৩,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিতো এখন তারা ৬,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিচ্ছে। আরইবিকে আরো কিভাবে শক্তিশালী করা যায় সে বিষয়ে কাজ করছি।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ভেঙে সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানী করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে পিডিবির ওনারশীপ ওই অর্থে নেই। কিভাবে পিডিবিকে ওনারশীপ দেওয়া যায় সে বিষয়ে অনেক স্টাডি হয়েছে সেগুলো তেমন কাজে আসেনি। এটাকেও রিভিউ করে দেখছি পিডিবিকে হোল্ডিং কোম্পানী করা উচিত নাকি আরো বিকল্প কোনো সমাধান আছে। পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্লানও রিভিউ করছি। ২০৪১ সালে ৭৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য সঞ্চালন ও বিতরণ খাত প্রস্তুত আছে কি না সেটা দেখছি। বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে ক্রসবর্ডার পলিসি থাকা দরকার সেটা নিয়েও কাজ করছি।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতে কেন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?

মোহাম্মদ হোসাইন: আসলে সরকার তো ব্যবসার জন্য না। সরকার ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করে দেয়। বিদ্যুৎ একটা সেবা খাত সেজন্য সরকারের নজরদারিটা থাকবে। এটাকে আরো গতিশীল করতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অবশ্যই দরকার। এখন বেসরকারি খাতের আইপিপিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৪২ শতাংশের মতো বাকিটা হলো সরকারি খাতে। কিন্তু আমি যখন এনার্জিতে দেখি তখন প্রায় ৫০ শতাংশ আইপিপি থেকে আসে। এর অর্থ হলো যে তারা খুবই দক্ষ এবং ভালো কাজ করছে। বরং তাদের দেখাদেখি সরকারি খাতকে পুশ করতে পারি। এতে করে এ খাতে একটা প্রতিযোগিতা থাকবে। বিনিয়োগের ঘাটতিটাও তারা পূরণ করছে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো সঞ্চালন ও বিতরণ খাতের কিছু অংশ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে অগ্রগতি কতটুকু।

মোহাম্মদ হোসাইন: বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য কিছু অংশ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে বিতরণ খাতে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বেসরকারি খাতে জেনারেশনে যে সাফল্য আমরা দেখছি তা না হলে এভাবে লোডশেডিং মুক্ত বিদ্যুৎ উপহার দিতে পারতাম না। এখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছি সঞ্চালন লাইন নিয়ে। বেসরকারি খাতে সঞ্চালন লাইন চালু হলে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সঞ্চালন লাইন বেসরকারি খাতে আছে। আইপিপি খাতে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে সরকার নির্ধারিত দাম দিয়ে বিদ্যুৎ কিনছে তেমনি বেসরকারি খাতের সঞ্চালন লাইনের জন্য হুইলিং চার্জ নির্ধারণ করা হবে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: সরকার বিদ্যুৎ আমদানি করছে কিন্তু সম্প্রতি রপ্তানীর আলোচনাও শুরু হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাই।

মোহাম্মদ হোসাইন: বিদ্যুৎ আমদানির একটা প্লানিং আছে তাহলো ২০৪১ সাল নাগাদ ৯,০০০ মেগাওয়াট আমদানি করা। ইতোমধ্যে আমরা ভারত থেকে ১,১০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ আমদানি করছি। এখন নেপাল, ভুটানে বিদ্যুৎ রপ্তানীর পরিকল্পনা করছি। কারণ আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় শীতকালে চাহিদা অনেক কমে যায়। ওই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানী করা হবে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সম্পাদক: আমিনূর রহমান
@ সর্বস্বত্ব এনার্জিনিউজবিডি ডটকম ২০১৫-২০১৯