‘মাতারবাড়ীর ৫,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বৈপ্লবিক অগ্রগতি আনবে বিদ্যুৎ খাতে’  

    এনার্জিনিউজবিডি ডটকম
    প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ রবিবার ০৩:৪৭ পিএম BdST     ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বৃহৎ হাব হতে যাচ্ছে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী। এই হাবে ২০৩০ সালের মধ্যে গড়ে তোলা হবে ৫,৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একাধিক কয়লা, এলএনজি, বায়ু ও সৌরভিত্তিক বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

সরকার নিয়ন্ত্রিত কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানী বাংলাদেশ লিমিটেড(সিপিজিসিবিএল)এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এবং পরিচালনা করবে। এজন্য চারটি প্রকল্পও চলমান আছে।

প্রকল্পগুলো চালু হওয়ার পর বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈপ্লবিক অগ্রগতি সাধিত হবে বলে মনে করেন সিপিজিসিবিএল এর বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া

চলমান প্রকল্পগুলো নিয়ে বিস্তারিতভাবে এনার্জিনিউজবিডি ডটকমকে বলেছেন গোলাম কিবরিয়া।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানী অনেকগুলো বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। কোন কোন প্রকল্প চলমান আছে?

গোলাম কিবরিয়া: বর্তমানে আমরা চারটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি। প্রকল্পগুলো হচ্ছে-কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে প্রথম পর্যায়ে ১,২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কোহেলিয়া ৭০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ৫০০-৬৩০ মেগাওয়াট এলএনজি ভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ১,২০০-১,৩২০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এই প্রকল্পগুলো ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে।

এছাড়া একই স্থানে দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো ১,২০০ মেগাওয়াট এবং ৭০০ মেগাওয়াটের পৃথক দুইটি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। মূলত মাতারবাড়ী হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বৃহৎ হাব। সবমিলিয়ে ৫,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করছি।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম:  আপনি যোগদানের পর জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)এর অর্থায়নে মাতারবাড়ী ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে?

গোলাম কিবরিয়া: আমি এই কোম্পানীতে কয়েকমাস আগে যোগদান করেছি। চলমান প্রকল্পগুলো সময়মতো সম্পন্ন করেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে কাজ করছি। মাতারবাড়ীতে ইতোমধ্যে ১৬০৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। দুই ইউনিট বিশিষ্ট মাতারবাড়ী ১,২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ভূমি উন্নয়নের কাজ পুরোদমে চলছে। প্রকল্পটি জাপানের দাতা সংস্থা জাইকা, বাংলাদেশ সরকার এবং সিপিজিসিবিএল এর অর্থায়নে বাস্তবায়ন হচ্ছে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন, তোশিবা করপোরেশন এবং আইএইচআই করপোরেশন এর যৌথ কনসোর্টিয়ামকে ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন(ইপিসি)কন্ট্রাক্টর হিসেবে ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা গত বছরের ২২ আগস্ট থেকে কাজ শুরু করেছে। এ পর্যন্ত কাজের আর্থিক অগ্রগতি ১৮ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ১৯ শতাংশ। আগামী ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট এবং জুলাই মাসে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম কেমন হতে পারে?

গোলাম কিবরিয়া: এটা এই মূহূর্তে বলা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা আমদানিসহ অন্যান্য সব খরচ মিলিয়ে দামটা নির্ধারণ হবে। যেহেতু এটি সরকারি কোম্পানী তাই এ কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক কম হবে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: কয়লা কোন দেশ থেকে আমদানি করা হবে এবং কয়লা খালাস করে তা কেন্দ্রে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া কি হবে?

গোলাম কিবরিয়া: আপাতত কয়লা আমদানির বিষয়টি নিয়ে আমরা ধীরে চলছি। কারণ কয়লার দাম আন্তর্জাতিক বাজারে উঠানামা করে। আমাদের কয়লার প্রয়োজন হবে ২০২৩ সালের শেষের দিকে। এজন্য আরো কিছুদিন পরে কয়লা আমদানির উৎস নির্ধারণ করা হবে। আর ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করতে যে কয়লার প্রয়োজন হবে চুক্তি অনুযায়ী তা ইপিসি কন্ট্রাক্টর সরবরাহ করবে। তবে কয়লা খালাসের জন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন সমুদ্রে সাড়ে ১৪ কিলোমিটার চ্যানেল খনন (যা সাড়ে ১৮ মিটার গভীর এবং ২৫০ মিটার প্রশস্ত) এবং জেটি নির্মাণসহ সব কাজই ইপিসি কন্ট্রাক্টর করবে। যেখানে ৮০ হাজার টন ক্ষমতার জাহাজও ভিড়তে পারবে। আর কয়লা মজুদ রাখার জন্য বৃহৎ আকারের কাভার্ড কোল ইয়ার্ডও নির্মাণ করা হচ্ছে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

গোলাম কিবরিয়া: বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে গ্রিড সাব-স্টেশন থাকবে। তবে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য মাতারবাড়ী থেকে চট্টগ্রামের মদুনাঘাট পর্যন্ত এবং মদুনাঘাট থেকে নারায়নগঞ্জের মেঘনাঘাট পর্যন্ত পৃথক ৪০০ কেভি ক্ষমতার দুইটি সার্কিটের সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করবে পাওয়ার গ্রীড কোম্পানী অব বাংলাদেশ লিমিটেড। যাতে মাতারবাড়ীর উৎপাদিতব্য বিদ্যুৎ ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। ইতোমধ্যে তারা কাজও শুরু করেছে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: অন্যান্য প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে বলুন।

গোলাম কিবরিয়া: কোহেলিয়া ৭০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সিঙ্গাপুরের সেম্বকর্প ইউটিলিটিস প্রাইভেট লিমিটেড এর সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণ, ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং ওনার্স ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ইপিসি কন্ট্রাক্টর নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান আছে। এই কেন্দ্রটি ২০২৫ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসবে।

আর ৫০০-৬৩০ মেগাওয়াটের এলএনজি ভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও জাপানের মিতসুই অ্যান্ড কোঃ লিমিটেডের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে নির্মাণ করা হবে। এ কেন্দ্রটির জন্যও জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং অন্যান্য কাজ চলমান আছে। ২০২৩ সালের মধ্যে কেন্দ্রটি উৎপাদনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ১,২০০-১,৩২০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এ কেন্দ্রটির জন্যও জমি অধিগ্রহণ, ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং অন্যান্য কাজ চলমান আছে। এটি উৎপাদনে আসবে ২০২৬ সালে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: আপনার কোম্পানীর নামেই ‘কোল’ শব্দটি আছে। তাহলে কেন এলএনজি ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছেন?

গোলাম কিবরিয়া: এটা সত্যি যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকে প্রাধান্য নিয়ে এ কোম্পানী গঠন করা হয়েছে। তবে অন্যান্য ফুয়েল ব্যবহার করেও এই কোম্পানী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারবে তা মেমোরান্ডাম অব আর্টিকেল এবং আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন এ বলা আছে। আমরা শুধু কয়লাকে একমাত্র ফুয়েল হিসেবে বিবেচনা করছি না। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জ্বালানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে এলএনজি ভিত্তিক, বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ইপিসি কন্ট্রাক্টর নিয়োগের আগে ঢাকায় হলি আর্টিজেনের মতো হামলার ঘটনার কারণে বিদেশীরা নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বর্তমানে নিরাপত্তার বিষয়টি সম্পর্কে বলুন।

গোলাম কিবরিয়া: বর্তমানে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে বিদেশীরা মাতারবাড়ী প্রকল্পে কাজ করছে। সেখানে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। ইপিসি কন্ট্রাক্টর আলাদা করে তাদের কর্মকর্তাদের জন্যও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। তার মানে এটা নয় যে তারা আমাদের নিরাপত্তায় সন্তুষ্ট নয়। তারা বাড়তি সর্তকতার জন্য এটা করেছে। নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে আমাদের সরকারও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই এখন আর আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে অনেক বির্তক আছে? আপনাদের কেন্দ্রগুলো কতটা পরিবেশ বান্ধব হবে?

গোলাম কিবরিয়া: আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণের খরচ সাব-ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন দক্ষতা প্রায় ৪৩ শতাংশ যেখানে সাব-ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির ৩৬ শতাংশের মতো। যেহেতু আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে ফলে কয়লার ব্যবহার কমে যাবে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড এর নির্গমন কমমাত্রায় হবে। উপরূন্ত, ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজেশন (এফজিডি) ব্যবহার করে সালফারকে পৃথক করে ফেলা হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এগজস্ট গ্যাস নির্গমনের জন্য ব্যবহৃত চিমনীর উচ্চতা হবে ২৭৫ মিটার। সবমিলিয়ে বলা যায়, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো হবে পরিবেশবান্ধব।

সম্পাদক: আমিনূর রহমান
@ সর্বস্বত্ব এনার্জিনিউজবিডি ডটকম ২০১৫-২০১৯