‘উন্নত বিশ্বের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে ঢাকা মহানগরে’  

    এনার্জিনিউজবিডি ডটকম
    প্রকাশিত: মার্চ ০৬, ২০১৮ মঙ্গলবার ০৫:০৮ পিএম BdST     ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

ঢাকা মহানগরের সবচেয়ে বেশি এলাকায় এবং নারায়নগঞ্জ শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড (ডিপিডিসি)।

এই কোম্পানীকে আধুনিকায়ন এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরে নানা পরিকল্পনা নিয়েছেন বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান

কিভাবে ডিপিডিসি’কে আরো গতিশীল ও উন্নত সেবা প্রদানের মাধ্যমে সেরা কোম্পানীতে রূপান্তর করা যায় সে বিষয়ে সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাৎকারে এনার্জিনিউজবিডি ডটকম এর সম্পাদক আমিনূর রহমানকে বিস্তারিত বলেছেন তিনি।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানীতে যোগদান করার পর আপনার সামনে চ্যালেঞ্জগুলো কি কি ছিলো?

বিকাশ দেওয়ান: বিলুপ্ত ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তপক্ষ (ডেসা) থেকে ডিপিডিসি নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা লাভের পর ২০০৮ সালের ১ জুলাই বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। ডেসার অনেক দায়ভার নিয়ে ডিপিডিসি’র উৎপত্তি। ডেসায় দুর্নীতিসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিলো। ডেসায় যে জনবল ছিলো তারা হয়তো ভালো লিডারশীপ পায়নি। একটা কোম্পানীতে যদি টপ লেভেল থেকে ভালো পরিকল্পনা ও কাজ করা হয় স্বাভাবিকভাবে লোয়ার লেভেলে কেউ দুর্নীতি কিংবা অপকর্ম করতে সাহস পায়না। সেক্ষেত্রে আমার ইচ্ছা হলো-এই কোম্পানীকে লাভজনক, সেবাধর্মী এবং নামকরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। তার জন্য প্রতিনিয়ত জনবল তথা আমার সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করছি। ডেসার আমলে সিস্টেম লস ছিলো ২০ শতাংশের উপরে এখন তা ৮ শতাংশ। ডিপিডিসি’র মূখ্য উদ্দেশ্যে হলো সেবা দেওয়া। অন্য যেকোনো সেবার চেয়ে ইলেক্ট্রিসিটি সেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেবা দেওয়ার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারিদের উদ্বুদ্ধ করতে পারাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু সেবা দিলেই হবে না প্রতিষ্ঠানটিকেও লাভজনক অবস্থায় রাখতে হবে। সেজন্য নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: একটা অভিযোগ শোনা যায়, গ্রাহকরা নির্ভরযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পাচ্ছে না। এখন এ অবস্থার কতটা উন্নতি হয়েছে।

বিকাশ দেওয়ান: আমি সবসময় গ্রাহকদের যেকোনো ধরনের অভিযোগ অথবা কথা শুনতে আগ্রহী। যোগদান করেছি সাত মাস হয়েছে। যোগদানের পর অনেকে অভিযোগ নিয়ে আসতো বিদ্যুৎ ঠিকমতো পাচ্ছি না। ইদানিং এ ধরনের অভিযোগ আর শুনি না। কারণ, কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে গতিশীল করা হয়েছে। গ্রাহকরা লিখিতভাবে অথবা ফোনে সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক অপারেশন অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস (এনওসিএস)এ অভিযোগ জানানোর পর পরই আমাদের টিম দ্রুত তা নিষ্পত্তি করছে। মোট ৩৬টি এনওসিএস আছে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে কোনো কালক্ষেপণ করা হচ্ছে না। আমি নিজে অনেক অভিযোগ নিষ্পত্তিতে তদারকি করছি। এতে ক্রমান্বয়ে গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হচ্ছি বলে আমার ধারণা।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: গ্রাহকদেরকে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দ্রুত দিতে কি পদক্ষেপ নিয়েছেন?

বিকাশ দেওয়ান: আবাসিক গ্রাহকদের সাতদিনের মধ্যে এবং সাধারণ শিল্পে ২৮ দিনের মধ্যে নতুন সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে বৃহৎ শিল্পের গ্রাহকদের পেতে একটু দেরি হয় এটা বলতে দ্বিধা নেই। কারণ গ্রাহক যে সাব-স্টেশন থেকে বিদ্যুৎ নেবে তার ক্যাপাসিটি এবং রাজউকের নতুন নিয়মানুযায়ী অকুপেন্সি সার্টিফিকেট (ভবন বা ভবনের আংশিক অংশ কমার্শিয়াল স্পেস হিসেবে স্বীকৃত কি না) ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র জমা দিতে হয়। আর সরকারের নির্দেশনা মতো দুই কিলোওয়াটের বেশি লোড বরাদ্দের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সৌর প্যানেল বসানো বাধ্যতামূলক। তবে গ্রাহকরা নিয়ম মেনে যথাযথভাবে আবেদন করলে দ্রুতই সংযোগ দেওয়া হচ্ছে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বর্তমান সাব-স্টেশনসহ ডিস্ট্রিবিউশন লাইন আরো আধুনিকায়ন করার জন্য কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন কি?

বিকাশ দেওয়ান: ঢাকা মহানগরসহ আশপাশের এলাকায় বিদ্যুতের ডিস্ট্রিবিউশন লাইন উন্নত বিশ্ব তথা চীনের সাংহাই কিংবা জাপানের টোকিও সিটির মতো গড়ে তুলতে পর্যায়ক্রমে সব ওভারহেড লাইনকে আন্ডারগ্রাউন্ড লাইনে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ওভারহেড লাইনে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে তাছাড়া অনেক লাইন জরাজীর্ণ এবং নানা জটিলতাও তৈরি হয়-যেমন ঝড়-বৃষ্টি হলে কিছুক্ষণ পরপরই লাইনে সমস্যা দেখা দেয় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন করা হলে এ ধরনের সমস্যা থাকবে না এবং উন্নত বিশ্বের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। এছাড়া মহানগরের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পাবে। আর ঢাকা শহরে জায়গা স্বল্পতার কারণে লোড সেন্টারে নতুন সাব-স্টেশন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য প্রাথমিক পর্যায়ে জাইকার অর্থায়নে ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকায় একটা আন্ডারগ্রাউন্ড সাব-স্টেশন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে যেসব সাব-স্টেশন ওভারলোড বা সমস্যা আছে তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: প্রি-পেইড মিটার সিস্টেম কতটুকু সফলভাবে কাজ করছে বলে আপনি মনে করেন?

বিকাশ দেওয়ান: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে অঙ্গীকার তারই অংশ হিসেবে প্রি-পেইড মিটার সিস্টেম চালু করা হয়েছে। প্রি-পেইড মিটার ঝামেলামুক্ত। গ্রাহকের জন্য এটা একটি সাশ্রয়ী পদ্ধতি এবং কোম্পানীর জন্যও অনেক সুবিধা। বিলের কাগজ সরবরাহ করা লাগে না এবং অগ্রিম বিল পাওয়া যায়। গ্রাহকরা কতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে তা নিজেই ঠিক করে নিতে পারে। প্রি-পেইড মিটারের কার্ড রিচার্জ নিয়ে শুরুর দিকে কিছুটা সমস্যা থাকলেও এখন সমস্যা তো নেই বরং অনেক সহজ হয়ে গেছে। গ্রাহকরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাকা রিচার্জ করার মতো প্রি-পেইড মিটারের কার্ড রিচার্জ করতে পারছে। ব্যাংক ও নিজস্ব ভেন্ডিং স্টেশন ছাড়াও ইতোমধ্যে গ্রামীণফোন কোম্পানীর সাথে চুক্তি হয়েছে। আরো কয়েকটি ফোন কোম্পানীর সাথে শিগগিরই চুক্তি করা হবে। রিচার্জ করার জন্য ভেন্ডিং স্টেশনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংক এবং অনলাইনের মাধ্যমেও রিচার্জ করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ডিপিডিসি’র মোট গ্রাহক বর্তমানে সাড়ে ১১ লাখের মতো। ইতোমধ্যে দুই লাখ ৩০ হাজার গ্রাহক পোস্ট পেইড থেকে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় এসেছে। এ বছরের মধ্যে জুনের মধ্যে তিন লাখ বসানো এবং আগামী অর্থ বছরে আট লাখ গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আর ২০২০ সালের মধ্যে ডিপিডিসি’র সব গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আনা হবে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি থাকবে কিনা?

বিকাশ দেওয়ান: গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাবে এটা সত্য। কিন্তু সার্বক্ষণিক তদারকি ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা মোকাবেলা করতে পারবো। এজন্য নতুন সাব-স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে এবং কয়েকটি সাব-স্টেশনের কাজও চলছে। যেসব লাইনের ট্রান্সফরমার ওভারলোডেড আছে সেখানে নতুন স্থাপন অথবা পরিবর্তন করা হচ্ছে। আশাকরি, এবার তেমন কোনো সমস্যা হবে না।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: গ্রাহকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হয় সেজন্য কি কি উদ্যোগ নিয়েছেন?

বিকাশ দেওয়ান: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী গ্রাহক তৈরিতে ইতোমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছি। ডিপিডিসি’র কর্মকর্তা-কর্মচারিরা গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। গ্রাহকদের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে এনার্জি দক্ষতা বেশি যাতে বিদ্যুৎ কম খরচ হয় এ ধরনের এনার্জি ইফিশিয়েন্ট পণ্য যেমন-এয়ারকন্ডিশন, ফ্রিজ, ফ্যান, লাইট ব্যবহারের অনুরোধ করা হচ্ছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকরা তাদের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন হলে বিদ্যুতের ব্যবহার অনেকাংশে কমে আসবে। এটি কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সম্পাদক: আমিনূর রহমান
@ সর্বস্বত্ব এনার্জিনিউজবিডি ডটকম ২০১৫-২০১৯