‘বাংলাদেশে এলএনজি আনার আগে আরো চিন্তা ও পরিকল্পনা দরকার’  

    এনার্জিনিউজবিডি ডটকম
    প্রকাশিত: মে ০১, ২০১৭ সোমবার ০৬:১০ পিএম BdST     ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

ড. ইজাজ হোসেন প্রায় ৪০ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক তিনি।

মূলত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে গবেষণা করেন এবং পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের এই বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে দিক নির্দেশনামূলক পরামর্শ দিয়ে আসছেন।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান ও ভবিষ্যত পরিস্থিতি নিয়ে এই বিশেষজ্ঞ এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এনার্জিনিউজবিডি ডটকম এর সম্পাদক আমিনূর রহমানকে বিস্তারিতভাবে বলেছেন।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানির প্রধান উৎস গ্যাস যার অর্ধেক সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানী শেভরন। ইতোমধ্যে তারা ব্যবসা গুটিয়ে চীনের একটি কনসোর্টিয়ামের কাছে তাদের সম্পদ বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ইজাজ হোসেন: এটি নিশ্চিতভাবেই ভালো খবর নয়। আমরা বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের সরবরাহের উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু এই গ্যাসক্ষেত্রটির ব্যবস্থাপনা খুবই জটিল ও কঠিন। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা দিয়ে শেভরন এই ক্ষেত্রটির ব্যবস্থাপনা বেশ ভালোভাবে করছে।নতুন কোম্পানি কিভাবে ক্ষেত্রটি পরিচালনা করে তা দেখার জন্য আমাদের এখন অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া বিবিয়ানার উৎপাদন কমবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। তাই গ্যাসক্ষেত্রটির ব্যবস্থাপনা বেশ ভালোভাবেই করতে হবে। তা না হলে গ্যাসক্ষেত্রটি আমরা খুব দ্রুত শেষ করে ফেলবো।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বাংলাদেশের স্থলভাগের অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নতুন স্ট্রাকচার আবিষ্কারের ব্যাপারে সরকার কতটা দায়িত্ববান?

ইজাজ হোসেন: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানী লিমিটেডকে (বাপেক্স)সব ধরণের সহায়তা দেয়া সত্ত্বেও কোনো নতুন বড় স্ট্রাকচার আবিষ্কৃত হয়নি। আবার স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর জন্য বিধি-নিষেধ রয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে ও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার ফলে স্থলভাগের মজুদ ও সম্পদের তথ্য এখনও অনেকটাই অজানা রয়ে গেছে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং এর ব্যবহার বাড়াতে ইতোমধ্যে দুইটি কোম্পানীর সাথে চুক্তি করেছে সরকার। আরো কয়েকটি কোম্পানীর সাথে চুক্তি করতে চায় এই পদক্ষেপ কতটা ফলপ্রুস হবে?

ইজাজ হোসেন: না, অবশ্যই নয়। এলএনজি খুবই ব্যয়বহুল জ্বালানি। বাংলাদেশের বাজারে এলএনজি আনার আগে আরো চিন্তা ও পরিকল্পনা করা দরকার। সব খাতে উচ্চ মূল্যের গ্যাসের প্রভাব কেমন পড়বে তা নিয়ে সঠিক গবেষণা করতে হবে। প্রাথমিক জ্বালানির সব ক্ষেত্র উন্মুক্ত এবং করমুক্ত করা উচিত।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বিদ্যুতের চাহিদার ঘাটতি মেটাতে আমদানির উপর ঝুঁকছে সরকার। এটা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কতটা সহায়ক হবে?

ইজাজ হোসেন: এখন পর্যন্ত এটি ঠিক আছে। তবে যদি এটি মোট সরবরাহের ২৫ শতাংশের বেশী অতিক্রম করে তবে দুইটি সমস্যা তৈরি হবে। এক. বিদ্যুতের মত মৌলিক পণ্যের জন্য অন্য দেশের উপর তীব্র নির্ভরশীলতা তৈরি হবে। এটি ভালো হবে না। সরবরাহকারী দেশের অস্থিতিশীলতায় সরবরাহেও বিঘœ ঘটবে। কোনো দেশের সাথে বিদ্যমান সুসম্পর্ক ভবিষ্যতে যে কোনো সময় নাও থাকতে পারে। দুই. বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মত মূল্যবান সুযোগ হারাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খুবই নিরাপদ এবং আকর্ষণীয় মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। এই ব্যবসাটি ধরতে পারলে এটি দেশে অনেকের চাকরির সুযোগসহ নানা সুবিধা তৈরি করবে। 

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বর্তমানে গ্রীষ্মকাল চলছে এখনো পর্যন্ত লোড-শেডিং এর তেমন বড় কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সরকার বিদ্যুৎ সংকট থেকে গ্রাহকদের মুক্তি দিতে পেরেছে বলে আপনি করেন?

ইজাজ হোসেন: হ্যাঁ, বৃহত্তর অর্থে এটি সত্য। শহর এলাকা এখন অনেকটাই লোডশেডিং মুক্ত। কিন্তু গ্রামের মানুষ এখনও ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন। অনেক দিন পর এখন আমরা শুনছি যে এই লোডশেডিং মূলত বিতরণ লাইন এবং সাবস্টেশনগুলোতে ত্রুটি এবং কম ক্ষমতার কারণে। যদি এটি সত্য হয়, তবে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন উন্নত করাটাও সরকারের দায়িত্ব। ভালো বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন, সঞ্চালন এবং বিতরণে সমন্বয় থাকা অপরিহার্য।

আবার আমাদেরকে এটিও স্মরণে রাখতে হবে যে, এ বছর এখনও তেমন গরম পড়েনি। যখন সত্যিকারের গরম পড়বে তখন দেখা যাবে, সরকার পরিস্থিতি কিভাবে সামলায়। আবার লো ভোল্টেজ এবং বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান এজন্য বেশ ভুগছে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: সরকার সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তেমনভাবে গৃহস্থালিতে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজিকে সবার ঘরে ঘরে পৌঁছানোর মতো কোনো কর্মসূচি নেওয়ার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি এবং তা কিভাবে হতে পারে?

ইজাজ হোসেন: এটি কিভাবে করা হবে তা আমি বুঝতে পারছি না। বর্তমানে এলপিজি’র সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি খাত। তাই প্রথমেই সরকারকে নিজস্ব অবকাঠামো নির্মাণ করে সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং এলপিজি বিতরণে জোর দিতে হবে। এরপর মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। ভর্তুকি যদি না দেয়া হয় তবে অধিকাংশ বাসাবাড়িতেই এলপিজি ব্যবহার করা যাবে না। আবার যদি সব গৃহস্থালিতে এলপিজি’র জন্য ভর্তুকি দেয়া হয় তবে জাতীয় বাজেটে টান পড়বে।

সম্পাদক: আমিনূর রহমান
@ সর্বস্বত্ব এনার্জিনিউজবিডি ডটকম ২০১৫-২০১৯