প্রসঙ্গঃ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র-পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর প্রভাব  

    প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন
    প্রকাশিত: নভেম্বর ০১, ২০১৬ মঙ্গলবার ১১:০৯ এএম BdST     ক্যাটাগরি: মতামত

বিদ্যুৎ ছাড়া সভ্যতার অগ্রযাত্রা অকল্পনীয়। যেকোন দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অপরিহার্য। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের ধারাকে অব্যাহত রেখে সরকার রূপকল্প ২০২১-এর মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশের মর্যাদায় উন্নীত করতে বদ্ধপরিকর।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যতীত এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা।

বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (ইনস্টল্‌ড ক্যাপাসিটি) ১২,৭৮০ মেগাওয়াট। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৭৬% বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে। মাথাপিছু বিদ্যুতের ব্যবহার ৪০৭ কিঃওঃঘঃ (ক্যাপটিভসহ)।

বিদ্যুৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমানকে ২৪,০০০ মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালে মধ্যে ৬০,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে হবে।

বর্তমানে গ্যাস দ্বারা ৬২.৩৮% বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই হার বজায় থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই গ্যাসের মজুদ অনেক কমে যাবে।

বিদ্যুৎ খাতে, শিল্প খাতে, পরিবহন খাতে, বাণিজ্যিক খাতে, আবাসিক রান্নার কাজে-সর্বত্রই গ্যাস প্রয়োজন।

গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বহুমুখী অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানী (সৌর, বায়ু ইত্যাদি) ব্যবহারপূর্বক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।

২০৩০ সালের মধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫০ ভাগ অর্থাৎ ২০,০০০ মেগাওয়াট অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কয়লা ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন করতে হবে।

সরকার সীমিত প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে কম খরচে কয়লার দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে যে কয়েকটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে তার মধ্যে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র অন্যতম, যা “মৈত্রী সুপার থারমাল পাওয়ার প্রজেক্ট” নামে পরিচিত।

উল্লেখ্য, সাউথ আফ্রিকায় মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৯৩%, চীনে ৭৮.৯%, অস্ট্রেলিয়ায় ৭৮%, ভারতে ৬৮%, আমেরিকায় ৪৯.১%, জাপানে ২৬.৮%, পাকিস্তানে ৬%, বাংলাদেশে ২.৫% এবং সমগ্র পৃথিবীতে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪১% কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়।

এতে দেখা যায়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বাংলাদেশের অবস্থান সারা পৃথিবীর মধ্যে সর্বনিম্ন।

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে মূল শহরে পর্যন্ত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির (আল্ট্রা-সুপার ক্রিটিকাল টেকনোলজি) এবং উন্নত ব্যবস্থাপনার ফলে পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব মুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে। এমনকি আমাদের দেশে বড়পুকুরিয়ায় অবস্থিত পুরাতন প্রযুক্তির (সাব-ক্রিটিকাল টেকনোলজি) বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এ পর্যন্ত এর কোন ক্ষতিকর প্রভাব পরিবেশে পড়েনি।

স্থান নির্বাচনঃ

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিতব্য প্রতিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থান নির্বাচনের পূর্বে ২-৩ বছর ব্যাপী Feasibility Study, Environmental Impact Assessment(EIA), Social Impact Assessment (SIA)-সহ ১০-১২টি সমীক্ষা সম্পন্ন করে প্রকল্পের স্থান নির্বাচন করা হয়।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের গাইড লাইন অনুযায়ী অভিজ্ঞ কর্মকর্তাগণ কর্তৃক বিভিন্ন অপশনের পর আর্থিক, কারিগরি ও সামাজিক দিক দিয়ে সম্ভাব্য যুক্তিযুক্ত হওয়ায় বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার রাজনগর ইউনিয়নের সাপমারি কাটাখালী ও কৈগড়দাসকাটি মৌজায় স্থানটি নির্ধারণ করা হয়।

সমীক্ষাঃ

বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে প্রাথমিক পরিবেশগত পরীক্ষা (IEE) ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।

এই মুহূর্তে প্রি-কন্সট্রাকশন এবং কন্সট্রাকশন সময়কালে পরিবেশগত পরিমিতি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ সমীক্ষা, কয়লা পরিবহনের জন্য অপর একটি পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) সমীক্ষা চলমান আছে। তাছাড়াও গত প্রায় তিন বছর যাবৎ ত্রৈমাসিক ভিত্তিক EMP মনিটরিং কাজ চলমান রয়েছে।

ভূমি অধিগ্রহণঃ

এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। সাধারণতঃ প্রতি মে.ও. বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ০.৫ হতে ০.৭ একর জায়গার প্রয়োজন হয়।

১,৩২০ মে.ও. করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এজন্য মোট ৯১৫.৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

অধিগ্রহণকৃত জায়গা নদীর তীরবর্তী হওয়ায়, নদীর তীর হতে প্রায় ৩০/৪০ মিটার দূর হতে বাঁধ নির্মাণ করা হবে। ১,৩২০ মে.ও. বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বহির্ভাগে প্রায় ১০০ একর জমিতে সবুজ বেষ্টনী বা বনায়ন করা হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চতুর্পাশে সবুজ বেষ্টনীতে প্রায় ২,০০,০০০ (দুইলক্ষ) গাছ রোপণ করা হবে।

প্রকল্প তথ্যাদিঃ

১।

প্রকল্প খরচঃ     

২.০০৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার (৭০% লোন, ৩০% ইক্যুয়িটি)

২।

ইক্যুয়িটি শেয়ারঃ

৫০ : ৫০ (বিউবো : এনটিপিসি)।

৩।

কার্যসম্পাদনঃ

২০১৯।

৪।

ভূমি অধিগ্রহণঃ

১৮৩৪ একর। তার মধ্যে ৯১৫.৫ একর বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানী লিমিটেড বরাবরে প্রদান।

৫।

উৎপাদন ক্ষমতাঃ

১,৩২০ মেঃওঃ (২x৬৬০মেঃওঃ)।

৬।

প্রযুক্তিবিদ্যাঃ

সুপারক্রিটিক্যাল।

৭।

জ্বালানিঃ

আমদানীকৃত কয়লা সালফার (সর্বোচ্চ ০.৯%), জিসিভি (কিলোক্যালরি / কেজি) : ৫,৪০০-৬,০০০।

৮।

কয়লার প্রয়োজনঃ          

দৈনিক ১০,০০০ মেট্রিক টন।

৯।

সম্ভাব্য কয়লার উৎসের দেশঃ      

ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিন আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং মোজাম্বিক।

১০।

কয়লা পরিবহনঃ

উৎস দেশ হতে প্রতি সপ্তাহে ৮০,০০০ টন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি মাদার ভেসেলে কয়লা বাংলাদেশের আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত আসবে।

আকরাম পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ১০,০০০-১২,০০০ টন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি বার্জ আকরাম পয়েন্ট থেকে প্রকল্পের স্থান পর্যন্ত আসবে।

১১।

চিমনির উচ্চতা-পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মানুসারেঃ

২৭৫ মিটার বা ৯০২ ফিট বা ৯০ তলা বিল্ডিং এর বেশী উচ্চতায়।

১২।

পানি শীতলিকরণ পদ্ধতিঃ

ক্লোজড সাইকেল  (কোন গরম পানি বের হবে না)।

 

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাবঃ

 

  • পরিবেশবান্ধব ১,৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থারমাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান সুন্দরবনের প্রান্ত সীমা থেকে ১৪ কি.মি. দূরে এবং ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট থেকে ৬৫ কি.মি. দূরে অবস্থিত। অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের গবেষণা ও মতামতের ভিত্তিতে বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের সকল নিয়মকানুন ও শর্ত মেনেই প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ চলছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিবেশ বান্ধব। যেকোনো স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগে কয়েকটি বিষয় চিন্তা করতে হয়। যেমন সেই স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে কী পরিমাণ মানুষকে স্থানান্তরিত করতে হবে, স্থানান্তরিত হবার ক্ষতিপূরণ কী পরিমাণ, এলাকাটি কৃষি জমি কিনা, সেখানকার পরিবহন ব্যবস্থা, পরিবেশ, আর্থ-সামাজিক প্রভাব, এলাকার উন্নয়ন ইত্যাদি বিবেচনা করতে হয়। বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থানে স্থানান্তরিত মানুষের সংখ্যা খুবই কম। কারণ সেখানে জমি অনুর্বর এবং কৃষির উপযোগী নয়। জায়গাটির অধিকাংশই সরকারি খাসজমি। ১,৩২০ মে.ও.  এর এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা পরিবহন, প্রয়োজনীয় পানির উৎস ইত্যাদি বিবেচনা করে এই জায়গাটি নির্বাচন করা হয়েছে।

 

  • বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে অত্যাধুনিক সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এই প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বল্প কয়লায় বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। ফ্লু-গ্যাস ডি-সালফারাইজেশন (এফজিডি) এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে নির্গত গ্যাসে SOx নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং বিশেষতঃ সালফার ডাই অক্সাইড (SO2) প্রায় সম্পূর্ণ শোষিত হবে। একইভাবে নাইট্রোজেন এর অক্সাইড (NOx) নির্গমন নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য আধুনিক বার্নার ডিজাইন করা হবে। এ কারণে নির্গত SOx বা NOx এর পরিমাণ নিরাপদ মাত্রার অনেক নীচে থাকবে।

 

  • বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে আমদানীকৃত কয়লা ব্যবহার করা হবে তা লো-এ্যাশ কন্টেন্ট এবং লো-সালফারযুক্ত। ফলে অল্প কয়লা ব্যবহারে আরো কম ছাই ও কম সালফার তৈরী হবে যা নিয়ন্ত্রণ করা বেশি সহজ হবে। উৎপাদিত ছাই Electro Static Precipitator (ESP) এর Hopper এ সংগৃহীত হবে এবং ১০০% ছাইসিমেন্ট, ইট তৈরী প্রভৃতি কাজে ব্যবহার করা হবে। ফলে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ছাই বাতাসে নির্গত হয়ে পরিবেশ দূষিত হবে না।

 

  • আবৃত অবস্থায় কয়লা পরিবহন, মজুদ এবং প্ল্যান্টে ব্যবহার করা হবে। ফলে বাতাসে উড়ে বা পরিবহনের সময় পানিতে মিশ্রিত হয়ে দূষণের কোনো সম্ভাবনা নেই। কয়লা পরিবহণের জাহাজ চলাচল নিয়ে ও উদ্বেগের কিছু নেই। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দৈনিক গড়ে একটি মাত্র ছোট জাহাজ দ্বারা (যার বহণ ক্ষমতা ১০-১২ হাজার টন) লাইটারেজ প্রক্রিয়ায় আবৃত অবস্থায় কয়লা আনা হবে। এতে পরিবহণের সময় কয়লা ছড়িয়ে পড়ার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। আর সপ্তাহে গড় একটি মাত্র মাদার ভেসেল আকরাম পয়েন্টে আসবে। এই বিষয়ে Environmental Impact and Social Assessment (EISA) সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে যার ফলাফল ও ইতিবাচক।

 

  • বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত চিমনীর উচ্চতা ৯০০ ফুটের অধিক হওয়ায় চিমনী থেকে নির্গত পরিশোধিত বায়ু প্রকৃতি ও পরিবেশের কোনো ক্ষতি করবে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চলমান অবস্থায় কোনো ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হবে না। অতি অল্প পরিমাণ পশুর নদীর (0.05% of the Lean Period) পানি ব্যবহার করা হবে। এতে পানির ব্যবহার ও অপচয় অত্যন্ত কম হবে। তাপমাত্রা কমানোর জন্য অত্যাধুনিক কুলিং টাওয়ারের মাধ্যমে ক্লোজড ওয়াটার রিসাইকেল সিস্টেম ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ একই পানি ঠান্ডা করে পুনরায় ব্যবহার করা হবে। যে সামান্য পানি পশুর নদীতে নির্গত হবে তা পরিশোধিত এবং তাপ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে অপরিশোধিত গরম পানি কোনোভাবেই পশুর নদীতে ফেলা হবে না।

 

  • এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন এবং রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বের হওয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশে সবুজবেষ্টণী (Carbon Sink) তৈরী করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সেখানে ২ লক্ষাধিক বৃক্ষরোপণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ৯৫০০ বৃক্ষরোপণ করা হয়ে গেছে। এই বনায়ন এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানী (প্রাঃ) লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) ইতোমধ্যেই বনবিভাগের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এছাড়াও সার্বক্ষণিক পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং তা চলমান থাকবে।

 

আন্তর্জাতিক মানের চুক্তিঃ

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সম্পাদিত চুক্তিটি সম্পূর্ণ সুষম আন্তর্জাতিক চুক্তি। প্রকল্প ব্যয়ের ৭০% ঋণ এবং ৩০% ইকুয়িটি। ৭০% ঋণ ও এর সুদ বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানী লিঃ পরিশোধ করবে। ইকুয়িটি ৩০% এর মধ্যে ১৫% বাংলাদেশ এবং ১৫% ভারত সরকার প্রদান করবে এবং মোট আয়ের অর্ধেক হিসেবে (৫০-৫০) বিউবো ও এনটিপিসি পাবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ এর শতভাগ বাংলাদেশে ব্যবহৃত হবে।

 

বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে নিঃসরিত গ্যাস ও এর গ্রহণযোগ্য মাত্রাঃ

গ্যাস

সুন্দরবনের বর্তমান অবস্থা

বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হলে

পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০০৫ সনের নীতিমালা অনুযায়ী

বিশ্বব্যাংকের গ্রহণযোগ্য মাত্রা

মন্তব্য

NOx মিলিগ্রাম প্রতি ঘনমিটার ( ɲg/nm3)(বছরে)

১৮

২৩.৯

১০০

৪০

নিঃসরিত গ্যাস নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে নিম্নে থাকায় সুন্দরবন বা পরিবেশের কোন ধরনের কোন ক্ষতির আশংকা নাই।

SOx মিলিগ্রাম প্রতি ঘনমিটার ( ɲg/nm3) (বছরে)

৯.৫

১৯.৩৬

৮০

-

Flue Gas Desulphurisation (FGD) স্থাপনে

৯.৫

০.৯৯

৮০

-

 

  • Electro Static Precipitator (ESP) যন্ত্র ব্যবহার করার মাধ্যমে উড়ন্ত ছাই (Fly Ash) এর ৯৯% ধরে রাখা সম্ভব হবে।
  • Flue Gas Desulphurization (FGD) যন্ত্র ব্যবহার করার মাধ্যমে ৯৬% সালফার ধরে রাখা হবে।
  • ESP FGD যন্ত্র ব্যবহার করার মাধ্যমে ৯০% এর অধিক পরিমাণ পারদ ধরে রাখা যাবে।

 

অর্থনৈতিক / প্রতিবেশগত প্রভাবঃ

মৈত্রী বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। আর্থ-সামাজিক দিক থেকে দেখতে গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হবে, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন হবে, জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বাড়বে, জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে, শিক্ষাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং উন্নত যোগাযোগ সুবিধা তৈরী হবে।

এছাড়া, জাতীয় জ্বালানী নিরাপত্তার ভিত্তি আরো সুদৃঢ় হবে, স্বল্প খরচে নির্ভরযোগ্য জ্বালানী সরবরাহ ও শিল্প উন্নয়ন হবে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেচ ব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্য এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ফলে পুরো এলাকাটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি এলাকায় পরিণত হবে।

এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে সুন্দরবনের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বনের উপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং বন কেটে বসতি স্থাপন ও আবাদ, মৎস্য আহরণ এবং নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড হ্রাস পাবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সম্প্রসারণের ফলে সুন্দরবনের উপর স্থানীয় অধিবাসীদের নির্ভরশীলতা কমবে, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য সুন্দরবনের ক্ষতিকর কর্মকান্ডের প্রবণতা হ্রাস পাবে যা সুন্দরবনের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

কর্পোরেট স্যোশাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) এর অংশ হিসেবে বিআইএফপিসিএলের জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ড স্থানীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। যেমন বিআইএফপিসিএল প্রকল্প এলাকায় প্রায় দুই বছর ধরে স্থানীয় অধিবাসীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং স্থানীয় মহিলা ও যুবকদেরকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার লক্ষ্যে সেলাই ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেছে।

সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রকল্প এলাকার জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতি ইউনিটে তিন পয়সা হিসাবে লেভী ধার্য করে উক্ত অর্থ দিয়ে একটি উন্নয়ন তহবিল গঠন করে প্রকল্প এলাকার মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে। এই হিসাবে তহবিলটিতে বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা জমা হবে যা জনকল্যাণ এবং বন সুরক্ষায় ব্যয় করা হবে।

উপসংহারঃ

পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলো লক্ষ লক্ষ মেঃওঃ (জার্মান, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে) নদী, বন ও খনিমুখের আশেপাশে অবস্থিত থাকে এবং এতে ইকোসিস্টেম, শব্দদূষণ, পরিবেশ দূষন, বর্জ্য নিঃসরন সমস্যা হচ্ছে না।

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও একইভাবে শূন্য ডিসচার্জ, সুপারক্রিটিকাল প্রযুক্তি, নিঃসরিত সকল ধরনের গ্যাস পরিবেশ অধিদপ্তরের গ্রহনযোগ্য মাত্রার নীচে রেখে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ও পরিবেশ বান্ধব যন্ত্রপাতি দ্বারা নির্মিত হবে বলে পরিবেশের কোন ক্ষতির আশংকা নাই।

প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন: মহাপরিচালক, পাওয়ার সেল, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ।

 

 

সম্পাদক: আমিনূর রহমান
@ সর্বস্বত্ব এনার্জিনিউজবিডি ডটকম ২০১৫-২০১৯