‘পিডিবি’র বড় অর্জন দেশের ৭৬ শতাংশ এলাকা এখন বিদ্যুতের আওতায়’  

    এনার্জিনিউজবিডি ডটকম
    প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০১৬ বৃহস্পতিবার ১১:২৭ এএম BdST     ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সবার ঘরে ঘরে ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছে রাষ্ট্রায়াত্ব প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

এজন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক বেসরকারি খাত থেকে আসছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে একটা সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এটা সম্ভব হয়েছে।

বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সাথে পিডিবি’র বর্তমান চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. শামসুল হাসান মিয়া দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন।

সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর অঙ্গীকার এবং বেসরকারি খাতসহ অন্যান্য বিষয়ে সম্প্রতি এনার্জিনিউজবিডি ডটকম সম্পাদক আমিনূর রহমান এর কাছে এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত বলেছেন শামসুল হাসান মিয়া

 

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড(পিডিবি) প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে গ্রাহকদের সেবা দিয়ে আসছে। আপনি নিজেও ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে এ সংস্থাটির সাথে সম্পৃক্ত। পিডিবি’র কার্যক্রমকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মো. শামসুল হাসান মিয়া: ১৯৭২ সালের ১ মে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। সেসময় একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিডিবি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও সরবরাহ করতো। সময়ের ব্যবধানে এবং চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন, সঞ্চালন ও সরবরাহের জন্য পৃথক কোম্পানী গঠন করা হয়।

তবে এখনো পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার প্রায় পুরোটাই সামাল দিচ্ছে পিডিবি। সেই সাথে কিছু কিছু অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহও করছে। তবে সঞ্চালনের কাজটি করছে পিডিবি’র একটি কোম্পানী।

পিডিবি’র সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সারাদেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ এলাকা বিদ্যুতের আওতায় এসেছে।

সরকারের ঘোষণা আছে, ২০২১ সালের মধ্যে সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু পিডিবিসহ বিদ্যুৎ খাতের অন্যান্য সংস্থা ও কোম্পানীগুলো চেষ্টা করছে ২০১৮ সালের মধ্যে এ কাজটি সম্পন্ন করতে। আশাকরি, আমরা সেটি করতে সফল হবো।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বিদ্যুৎ খাতে কোম্পানী গঠন করে কতটা সফলতা পাওয়া গেছে বলে আপনি মনে করেন?

শামসুল হাসান: এটা সরকারের নীতিগত ব্যাপার। তবে সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে যেকোনো কিছুরই সফলতা আসে। সঠিক ও দক্ষভাবে পরিচালনা করতে পারলে এ খাতের কোম্পানীগুলোকে আরো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

সরকারের ও পিডিবি’র কোম্পানীগুলো এখন ভালোমতো কাজ করছে। তবে কোম্পানীগুলোর কার্যক্রম আরো সুচারুভাবে মনিটরিং করার প্রযোজন এবং নজর দেওয়ার সময় এসেছে।

“সরকারের ও পিডিবি’র কোম্পানীগুলো এখন ভালোমতো কাজ করছে। তবে কোম্পানীগুলোর কার্যক্রম আরো সুচারুভাবে মনিটরিং করার প্রযোজন এবং নজর দেওয়ার সময় এসেছে।”

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ আসে বেসকারি খাত অর্থাৎ ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রোডিউসার বা আইপিপি থেকে। আপনি দীর্ঘদিন ধরে আইপিপি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে জড়িত ছিলেন। এ খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও এর উদ্যোক্তাদের ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?

শামসুল হাসান: এটি সত্য যে, মোট বিদ্যৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক বেসরকারি খাত থেকে আসছে। সরকার চায় সব সময় জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে। এ খাতের প্রকল্পের অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সরকারের একার পক্ষে তা সামাল দিয়ে উঠা সম্ভব হয় না।

সেজন্যই বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বেসরকারি খাতের দুই-একটি কোম্পানী বাদে বাকিগুলো দক্ষ ও যোগ্যভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চাহিদা মেটাচ্ছে। এটিই এ খাতের সবচেয়ে বড় সফলতা।

আর এ খাতের উদ্যোক্তারা অনেক সাহসী ও বিচক্ষণ বলেই সমানতালে সরকারের পাশাপাশি নিরলসভাবে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেসরকারি কোম্পানীগুলো চায় তারা নিজেরা তরল জ্বালানি তথা ডিজেল, ফার্নেস অয়েল আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে। এটি এ খাতের জন্য কতটা সহায়ক।

শামসুল হাসান: এখন বেশ কয়েকটি কোম্পানী তরল জ্বালানি মূলত ফার্নেস অয়েল আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন যে তেল আমদানি করে তার কোয়ালিটি নিয়ে কোম্পানীগুলো প্রায়ই অভিযোগ তোলে।

এজন্য কোম্পানীগুলোকে তেল আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন আর দোষারোপ করার জায়গাই নেই।

আর নিজেদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মেশিনের স্বার্থেই তারা ভালোমানের তেল আমদানি করবে এটাই স্বাভাবিক। এটি বরং পিডিবি এবং কোম্পানীগুলোর জন্য ভালো।

“পিডিবি’র আওতাধীন এলাকায় প্রায় ৭০ হাজার প্রি-পেইড মিটার বসানো হয়েছে। আরো ১ লাখ ৩৯ হাজার প্রি-পেইড মিটার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে করে সিস্টেম লস কমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবে।”

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লাকে জ্বালানি হিসেবে কেন এতো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?

শামসুল হাসান: এক কথায় বলতে গেলে প্রাকৃতিক গ্যাসের স্বল্পতা। এখনো দেশের সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস থেকে। আর এ জ্বালানি সরবরাহ করে পেট্রোবাংলা।

ইতোমধ্যে পেট্রোবাংলা বলেছে, তারা নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আর গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে না। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন তো থামিয়ে রাখা যাবে না। কারণ, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে বিদ্যুৎ।

তাই গ্যাসের স্বল্পতা আর কমমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে জোর দেওয়া হচ্ছে।

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ রয়েছে যেখানে মূল শহরে পর্যন্ত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি আর অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনার ফলে পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব মুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে।

এমনকি আমাদের দেশে বড়পুকুরিয়ায় অবস্থিত পুরানো প্রযুক্তি অর্থাৎ সাব-ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এ পর্যন্ত এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাবের কথা শোনা যায়নি।

২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ৫৯টি দেশে কয়লা থেকে ১৪ লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হবে ভারত ও চীনে।

উন্নত দেশে গড়ে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের হার বছরে যেখানে ২০ টন-সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ০.২৫ টন। তবুও দূষণের মাত্রা নূন্যতম পর্যায়ে রাখতে বদ্ধপরিকর সরকার।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গতি এতো শ্লথ কেন? পিডিবি’র কি কি পরিকল্পনা আছে এ খাত নিয়ে?

শামসুল হাসান: নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কয়েকটি উৎস আছে যেমন- সৌরশক্তি, জল, বায়ু ইত্যাদি। এর মধ্যে প্রধানত সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে পিডিবি। সৌরশক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে জায়গা এবং এর প্রকল্প ব্যয়ই একটি বড় অন্তরায়। কারণ ১ মেগাওয়াট সৌরশক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চার একর জায়গা লাগে।

সে হিসাবে ১০০ মেগাওয়াটের জন্য ৪০০ একর জায়গা প্রয়োজন। কিন্তু চাইলেই সে জায়গা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইতোমধ্যে কাপ্তাইতে ৭ মেগাওয়াট, টেকনাফে ২০০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ৫০ মেগাওয়াট এবং রংপুরে ৩০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

এছাড়া নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য হাইড্রোবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বিনিয়োগের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

“২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ৫৯টি দেশে কয়লা থেকে ১৪ লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হবে ভারত ও চীনে।” 

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: ভারতসহ সার্কভুক্ত দেশগুলো থেকে কেন বিদ্যুৎ আমদানির প্রয়োজন হচ্ছে?

শামসুল হাসান: বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন উৎস ব্যবহার করতে চায় সরকার। বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রাথমিক জ্বালানি এবং জায়গা আমাদের দেশে সহজলভ্য নয়। সেইসঙ্গে অর্থায়নের বিষয়টি জড়িত।

এসব বিষয় মাথায় রেখে ভারতের সরকারি ও বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে এবং অদূর ভবিষ্যতে আরো করা হবে। ইতোমধ্যে ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এছাড়া রিলায়েন্সসহ অন্যান্য কোম্পানীর সঙ্গে আলোচনা চলছে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: সম্প্রতি দেশের দশটি স্থানে বেসরকারি খাতে তেলভিত্তিক ১০০ মেগাওয়াট করে মোট ১,০০০ মেগাওয়াটের নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত কেন?

শামসুল হাসান: বেশকিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবসরে গেছে এবং আগামী দুই এক বছরের মধ্যে আরো কয়েকটি অবসরে যাবে। এ কারণেই মূলত এ কেন্দ্রগুলো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া গ্যাসের স্বল্পতা থাকায় এ মূহুর্তে আর বিকল্প কিছু নেই।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহারের জন্য কি কি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?

শামসুল হাসান: পিডিবিসহ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানীগুলো প্রি-পেইড মিটার সিস্টেম ব্যাপকভাবে চালু করতে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে পিডিবি’র আওতাধীন এলাকায় প্রায় ৭০ হাজার প্রি-পেইড মিটার বসানো হয়েছে। আরো ১ লাখ ৩৯ হাজার প্রি-পেইড মিটার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে করে সিস্টেম লস কমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবে।

এনার্জিনিউজবিডি ডটকম: সরকারের নির্দেশনা রয়েছে পিডিবিকে পেট্টোবাংলার ন্যায় করপোরেশনে রূপান্তর করার জন্য। এ ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

শামসুল হাসান:  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মতো পিডিবিকে করপোরেশনে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজটি কিভাবে করা যায় সেজন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ওই প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আগ্রহপত্র (ইওআই) চাওয়া হয়েছে।

খুব শিগগিরই ওই প্রতিষ্ঠানটি চূড়ান্ত করা হবে। এরপর ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

সম্পাদক: আমিনূর রহমান
@ সর্বস্বত্ব এনার্জিনিউজবিডি ডটকম ২০১৫-২০১৯