বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের আইনবহির্ভূত হস্তক্ষেপ বিপন্ন করছে বিইআরসির স্বাধীনতা  

    ড. এম শামসুল আলম
    প্রকাশিত: মে ১১, ২০১৬ বুধবার ১০:১২ পিএম BdST     ক্যাটাগরি: মতামত

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ মতে তিনিই ভোক্তা, যিনি বিধি দ্বারা নির্ধারিত মূল্যে পণ্য ক্রয় বা সেবা গ্রহণ করেন বা করতে সক্ষম

যিনি তা পারেন না, তিনি ভোক্তা হিসেবে স্বীকৃত নন। ওই পণ্য বা সেবা লাভের অধিকারী নন। এ আইনে জ্বালানি ও বিদ্যুতের লভ্যতায় সেবা। সুতরাং এ আইনে পণ্য হোক আর সেবাই হোক, তা মূল্যের বিনিময়ে লাভ করলে বা করতে সক্ষম হলে তার ওপর ভোক্তার স্বত্বাধিকার অর্জিত হয়।

সে স্বত্বাধিকার সংরক্ষণে বিধি দ্বারা জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যহার নির্ধারণ একটি মৌলিক বিষয়। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ  খাত উন্নয়ন নীতি, কৌশল ও পরিকল্পনা ভোক্তা তথা গণবান্ধব না হলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয়হার বৃদ্ধির প্রবণতা বাড়ায় মূল্যহার বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে। ফলে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় অনিশ্চয়তা নেমে আসে। বর্তমানে এমন অনিশ্চয়তা দৃশ্যমান। এ প্রেক্ষাপটে এ লেখা।

দুই.

সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদ মতে, ভূমি ও সাগরের অন্তঃস্থ সব জ্বালানি সম্পদের মালিক প্রজাতন্ত্র এবং ৭ অনুচ্ছেদ মতে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। ১৩ অনুচ্ছেদ মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালির মালিক জনগণ।

ফলে জনগণের মালিকানায় রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি খাতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ  উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালির সৃষ্টি হয় এবং ১৫ অনুচ্ছেদ মতে, রাষ্ট্র জনগণের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ চাহিদা মেটায়। ১৯ অনুচ্ছেদ মতে, তা বণ্টন  ও বিতরণে রাষ্ট্রকে সমতা নিশ্চিত করতে হয়। ২১ অনুচ্ছেদ মতে, জাতীয় সম্পদ হিসেবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ  রক্ষা করা জনগণের দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই দেশের যেকোনো নাগরিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সম্পদ রক্ষার জন্য আন্দোলন করতে পারেন।

এমনকি ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করতে পারেন। তাছাড়া ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন রক্ষার নিশ্চয়তা থাকায় জ্বালানি নিরাপত্তার অভাবে জনজীবন যদি বিপন্ন/হুমকির সম্মুখীন হয়, তাহলেও তার প্রতিকারের জন্য রিট আবেদন করা যায়।

তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরী কমিশনের (বিইআরসি) দায়িত্ব যথাযথভাবে প্রতিপালন করলে ভোক্তাদের আন্দোলন কিংবা রিট আবেদন কোনোটিই করার দরকার হয় না। তাই ভোক্তাদের জন্য বিইআরসি এবং তার দক্ষতা ও সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

তিন.

পণ্য বা সেবা পাওয়া দেশের যেকোনো মানুষের মৌলিক অধিকার, তা মূল্যের বিনিময়ে লাভ করার সামর্থ্য তার থাক বা না থাক, তিনি তা পাবেন। রাষ্ট্রের গৃহীত নীতি বা কৌশল সে প্রাপ্তি নিশ্চিত করে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে যেসব উপকরণ বা সামগ্রী পণ্য বা সেবা হিসেবে ভোক্তা পাবেন, জ্বালানি ও  বিদ্যুৎ তাদের অন্যতম। ফলে সংবিধান সূত্রে জ্বালানি ও বিদ্যুতে জনগণের থাকা স্বত্বাধিকার এ আইনে সংরক্ষিত নয়। অর্থাৎ ভোক্তাবহির্ভূত জনগণের জ্বালানি অধিকার সংরক্ষণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন ২০০৩ সীমাবদ্ধ।

ফলে বাণিজ্যিক বিবেচনায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, আমদানি, সঞ্চালন, বিতরণ ও বণ্টনে গৃহীত নীতি ও কৌশল এবং বিধি ও বিধান সংবিধান সূত্রে অর্জিত জ্বালানি ও বিদ্যুতে জনগণের স্বত্বাধিকার সংরক্ষণে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং ক্ষেত্র বিশেষে সাংঘর্ষিক। তাই এ আইনে জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণে বিইআরসিকে বিশেষভাবে সজাগ ও সতর্ক থাকা দরকার।

চার.

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন ২০০৩ মতে, বিইআরসি এনার্জি সেক্টরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান। ওই আইনে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্যাস সম্পদ ও পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের সঞ্চালন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, ওই খাতে ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, মূল্যহার নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনায়ন, ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বিইআরসি প্রতিষ্ঠিত।

ওই আইনের ২২ ধারার বিধানাবলিতে কমিশনকে প্রদত্ত ক্ষমতাবলির মধ্যে এ প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্য: ১. এনার্জি অডিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয় নিশ্চিত, ২. লাইসেন্সির সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে স্কিম অনুমোদন করা, ৩. গুণগত মান নিশ্চিতে কোডস অব স্ট্যান্ডার্ডস প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা, ৪. এনার্জি পরিসংখ্যান সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পর্যালোচনা ও প্রচার করা, ৫. সমতা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং ৬. ভোক্তা বিরোধ, অসাধু ব্যবসা বা সীমাবদ্ধ (মনোপলি) ব্যবসা-সম্পর্কিত বিরোধের উপযুক্ত প্রতিকার নিশ্চিত করা এবং আইনের ৩৪ ধারার বিধানাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ১. মূল্যহার নির্ধারণ-সংক্রান্ত নীতিমালা ও পদ্ধতি প্রণয়ন ও তা অনুসরণ করা ২. তাতে ভোক্তা স্বার্থ বিবেচনা করা এবং ৩. দক্ষতা, ন্যূনতম ব্যয়, উত্তম সেবা প্রদান ও উত্তম বিনিয়োগ বিবেচনা করা।

তাছাড়া বিইআরসি আইন ও বিইআরসির আদেশ লঙ্ঘন এ আইনের ৪২ ও ৪৩ ধারা মতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সে অপরাধের দায়ে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। এসব ক্ষমতাবলে বিইআরসি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অসাধু ব্যবসা মুক্ত রাখতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি করতে পারে।

স্বল্পতম ব্যয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। গ্রাহকভেদে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বণ্টন ও মূল্যহার নির্ধারণে সমতা নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি প্রান্তিক গ্রাহক শ্রেণীকে মূল্যহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে পারে। এসব সম্ভব হলে ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে বিইআরসি সফল হবে।

পাঁচ.

জীবন ধারণের জন্য মানুষের খাদ্য, পানি, বায়ু ও বাসস্থান যেমন অপরিহার্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেমনই অপরিহার্য। তাই তা প্রাপ্তি তার এখন মৌলিক অধিকার। দারিদ্র্য বিমোচন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য যা করণীয়, তার জন্য সামর্থ্য বা সক্ষমতা থাকা চাই। সে সক্ষমতা নির্ভর করে অপরিহার্য পণ্য খাদ্য ও বাসস্থান এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবার ওপর জনগণের কতখানি স্বত্বাধিকার আছে, তার ওপর।

যদি  সে স্বত্বাধিকার প্রকৃতই থেকে থাকে, তাহলে মাথাপিছু বাণিজ্যিক জ্বালানি/বিদ্যুৎ প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং সে প্রবাহ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। ফলে দারিদ্র্য নিরসন অব্যাহত থাকে এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক সাড়া পড়ে। বাংলাদেশ এখন সে অবস্থার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তবে সংস্কারের নামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ব্যক্তিখাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য গৃহীত নীতি ও কৌশলের ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যহার দ্রুত ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধির সামঞ্জস্যতা রক্ষা করতে না পারায় সংকট নিরসন হচ্ছে না।

তাতে অচিরেই জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর সাধারণ ভোক্তা তথা জনগণের স্বত্বাধিকার টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। ফলে জ্বালানি/বিদ্যুৎ প্রবাহ প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে এবং নিম্ন আয়ের ফাঁদে আটকে পড়া মানুষের মুক্তি ও জীবনমান উন্নয়ন অনিশ্চয়তার শিকার হবে। তাই এ বিষয় মূল্যহার নির্ধারণে বিইআরসির বিশেষভাবে বিবেচনা করা দরকার। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হতে হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ৭ শতাংশের অধিক হারে অর্জন করতে হবে।

সেজন্য জ্বালানি প্রবাহ প্রবৃদ্ধি এমন হতে হবে, যাতে বিদ্যুৎ প্রবাহ প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ হারে অব্যাহত থাকে। সে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জ্বালানি প্রবাহ প্রবৃদ্ধি একদিকে যেমন নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে তেমন স্বল্প মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জ্বালানি মিশ্রণে গুণগত ও পরিমাণগত পরিবর্তন আনতে হবে। উল্লিখিত ওসব কারণে যথাযথভাবে সেসব পরিবর্তন আসেনি। প্রবৃদ্ধি বজায় রাখাও সম্ভব হয়নি।

ছয়.

২০০৮ সালে খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি সহনীয় পর্যায়ে থাকেনি। খাদ্যসংকট মোকাবেলায় বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানি করতে হয়। ফলে চালের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। তখন বাজারে খাদ্যঘাটতি না থাকলেও ক্রয়ক্ষমতা না থাকার কারণে জনগণ অন্নকষ্টের শিকার হয়। ফলে যেকোনো সময়ের তুলনায় তখন খাদ্যনিরাপত্তা ছিল অধিকতর বিপর্যস্ত।

আদিকালে কৃষক নিজের শ্রমে খাদ্য উৎপাদন করে খাদ্যের মালিক হতেন। বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন কেবল ভূমি ও শ্রমনির্ভরই নয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নির্ভরও। ২০০১ সালে কৃষিতে বাণিজ্যিক জ্বালানি ব্যবহার হয় ১১০ বিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য জ্বালানি। অর্থাৎ সে বছরে ব্যবহূত মোট বাণিজ্যিক জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ। বর্তমানে তার পরিমাণ আড়াই গুণ ছাড়িয়ে গেছে। কৃষি এখন শিল্পের মতোই জ্বালানি এবং প্রযুক্তিঘন।

চাষে তরল জ্বালানি, সেচে বিদ্যুৎ, সারে গ্যাস এবং কীটনাশকেও জ্বালানি লাগে। তাই কৃষিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কতটা সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা যায়, তার ওপর নির্ভর করে খাদ্যের ওপর কত সহজে ভোক্তার স্বত্বাধিকার অর্জিত হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর স্বত্বাধিকার অর্জনে জনগণ সক্ষম না হলে জ্বালানি নিরাপত্তা বিপর্যয়ে পড়ে। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা বিপন্ন হয়। তাই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর জনগণের স্বত্বাধিকার নিশ্চিত হতে হবে। সুতরাং জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিপর্যয়ের মধ্যে রেখে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ সত্য অনুধাবন করা জরুরি।

সাত.

মানুষ অন্নকষ্টের শিকার হবে কিনা, তা যেমন খাদ্যঘাটতি না থাকার ওপরই শুধু নির্ভর করে না, নির্ভর করে যেমন তার উৎপাদন ব্যয় কিংবা বাজারমূল্যের ওপর, তেমন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতি না থাকলেও যদি তার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, কিংবা বাজারমূল্যে তা কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলেও তার ওপর স্বত্বাধিকার অর্জিত না হওয়ায় খাদ্যের মতোই মানুষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কষ্টের শিকার হয়।

তাই আমাদের মতো নিম্নবিত্তের মানুষের দেশে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে এবং সেসঙ্গে ভর্তুকির সহায়তায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাজারমূল্য খাদ্যের অনুরূপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, যাতে তার ওপর মানুষের স্বত্বাধিকার নিশ্চিত হয়। শুধু ভর্তুকিতে সে মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে না, স্বল্পতম ব্যয়ে উৎপাদন নিশ্চিত করার কৌশল গ্রহণ করতে হয়।

কিন্তু মূল্যহার নির্ধারণে ভর্তুকিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে, সরবরাহ ব্যয় কমিয়ে আনার কৌশল গ্রহণের প্রতি নজর দেয়া হয়নি। বরং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রেখে ভর্তুকি কমানোর কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ ও বিপণন ব্যয় কমিয়ে এনে আর্থিক ঘাটতি হ্রাস করে ভর্তুকি কমানোর কৌশল গ্রহণ গুরুত্ব পায়নি।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বণ্টন এবং মূল্যহার নির্ধারণে সমতা নিশ্চিত করার কোনো কৌশল গ্রহণ না করায় ভোক্তারা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। মূল্যহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের অভিঘাত থেকে প্রান্তিক ভোক্তা শ্রেণীর সুরক্ষায় গৃহীত কৌশল নামমাত্র, ফলপ্রসূ নয়।

কেবল  জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যহার বৃদ্ধি করে ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের কৌশল গ্রহণ করার কারণে ভোক্তাদের স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষণে বিইআরসি সফল হয়নি।

আট.

বিইআরসি আইনে এনার্জির সংজ্ঞায় এনার্জি হিসেবে গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অন্তর্ভুক্ত হলেও কয়লা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন এবং ব্যক্তিখাত বিদ্যুৎ উৎপাদন বিইআরসির আওতাভুক্ত নয়। বাংলাদেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বাজার উন্মুক্ত অর্থাৎ ডিরেগুলেটেড নয়, রেগুলেটেড।

আপস্ট্রিমে রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ এবং ডাউনস্ট্রিমে বিইআরসি। আইন ও প্রবিধান অনুসারে বিইআরসি সে রেগুলেটরির দায়িত্ব পালন করে, সরকার পালন করে অ্যাডহকভিত্তিতে ইচ্ছাধীনে। এমন ভয়াবহ অসঙ্গতি ভাবা যায় না। 

নয়.

জ্বালানি তেল ও সিএনজির ফিড গ্যাসের মূল্যহার নির্ধারণের একক এখতিয়ার বিইআরসির। কিন্তু বিইআরসি সে মূল্যহার নির্ধারণ করে না। সরকারি খাতের গ্যাস ক্রয় মূল্যহার নির্ধারণ প্রক্রিয়ার মতোই এ মূল্যহার নির্ধারণ প্রক্রিয়ারও কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

সরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার যাচাই-বাছাইয়ের এখতিয়ার বিইআরসির হলেও ব্যক্তিখাতের ক্ষেত্রে বিইআরসির সে এখতিয়ার নেই। ব্যক্তিখাতের গ্যাস ক্রয় চুক্তিও ব্যক্তিখাত বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির মতোই অস্পষ্ট, অস্বচ্ছ এবং অসম। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যক্তি ও সরকারি খাতের মধ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি হয়নি। বাজার ব্যক্তিখাত মনোপলির শিকার।

তাতে অসাধু ব্যবসার প্রসার ঘটেছে এবং ভোক্তাস্বার্থ বিপন্ন হয়েছে। ফলে এনার্জির পাইকারি ও খুচরা বিক্রয় মূল্যহার নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনায়ন, ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিইআরসির জন্ম হলেও সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বিইআরসি আইনের সীমাবদ্ধতা ও বিইআরসির কর্মকাণ্ডে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের আইনবহির্ভূত হস্তক্ষেপ বিইআরসির স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে যেমন বিপন্ন করেছে, ভোক্তা অধিকারকেও তেমন বিপর্যয়ের মধ্যে রেখেছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে আছে।

দশ.

আপস্ট্রিম তথা জলে ও স্থলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রম জানা,  বোঝা বা বলার কোনো আইনি অধিকার বিইআরসির নেই। অথচ গ্যাস খাতে ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি করতে হবে  বিইআরসির। এখানেই বিপত্তি।

অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রমে দেখা যায়, প্রতি হাজার ঘনফুট স্থলভাগের গ্যাসের মূল্য বাপেক্স পায় ২৫ টাকা। অথচ আইওসি পাচ্ছে ২৩০ টাকা (২ দশমিক ৯৮ ডলার), ২০১২ সালের চুক্তি মতে, গভীর সাগরের গ্যাসের জন্য পাবে ৩২৫ টাকা (৪ দশমিক ১৬ ডলার) এবং ২০১৪ সালের চুক্তি মতে, তা হবে ৫৪০ টাকা (প্রায় ৭ ডলার)।

আবার এলএনজি হিসেবে আমদানিকৃত গ্যাসের মূল্যহার হবে ১ হাজার ১০০ টাকা (প্রায় ১৪ ডলার)। অথচ বাপেক্সের মূল্যহার ২৫ টাকা থেকে আর বাড়েনি। বাপেক্সের ব্যয়হার ৬৫ টাকা। সরবরাহকৃত মোট গ্যাসে তার গ্যাসের অনুপাত ৪ দশমিক ২৫ শতাংশের বেশি হয়নি। গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গঠনের পরও গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে নিয়োজিত দেশী কোম্পানির বিনিয়োগ ও  কারিগরি সক্ষমতা উন্নয়ন হয়নি।

এ তহবিলের অর্থ বিইআরসির আদেশ ও প্রণীত নীতিমালা মতে ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিইআরসি সক্ষম হলে এসব দেশী কোম্পানির সার্বিক সক্ষমতা এত দিনে বিশ্বমানে উন্নীত হতো। সরবরাহকৃত গ্যাসে তাদের গ্যাসের অনুপাত বৃদ্ধি পেত। তাতে গ্যাসের সরবরাহ ব্যয়হার কম হতো। আয় উদ্বৃত্ত হতো। জ্বালানি খাতে সমৃদ্ধি আসত। কিন্তু এসব কোনো কিছুই হয়নি।

এগারো.

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সুষম প্রতিযোগিতা ও সমতা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। অথচ তা হয়নি। ব্যক্তিখাত বিনিয়োগ আকর্ষণের তাগিদে মুনাফার মার্জিন বৃদ্ধির নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে স্বল্পতম ব্যয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবারাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভোক্তারা মূল্যহার বৃদ্ধির মতো নাজুক পরিস্থিতির শিকার।

বিইআরসি নির্বিকার। ভোক্তা পর্যায়ে তেলের মূল্যহার নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির। কিন্তু নির্ধারণ করে জ্বালানি বিভাগ। ব্যক্তিখাত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত জ্বালানি তেল তার মালিকানায় আমদানির সুযোগ পাওয়ায় সার্ভিস চার্জসহ তেলের দরপতন এবং শুল্ক ও ভ্যাট মুক্ত সুবিধা পায়।

বিপিসির কাছে জ্বালানি তেল কেনায় সরকারি খাত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সেসব সুবিধা পায় না। এমন বৈষম্য প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি, অসাধু ব্যবসা প্রতিরোধ এবং ভোক্তাস্বার্থ ও অধিকার সুরক্ষায় বড় বাধা। সে বাধা সৃষ্টি করেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। বিইআরসি তা অপসারণে অপারগ ও সামর্থ্যহীন।

বারো.

পেট্রোবাংলার প্রস্তাবে ও জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনে গ্যাসের সম্পদ মূল্য ধারণা এবং সে মূল্যহার ২৫ টাকা নির্ধারিত হওয়া আইনি কর্তৃত্ববহির্ভূত হলেও বিইআরসি তাতে আপত্তি দেয়নি, গ্রহণ করেছে। বিইআরসির আদেশে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ২০১১ গঠিত হয়।

সে নীতিমালা উপেক্ষা করে জ্বালানি বিভাগ স্বীয় বিবেচনায় ভিন্ন একটি গ্যাস উন্নয়ন তহবিল নীতিমালা ২০১২ প্রণয়ন করে ভোক্তাদের অর্থে গঠিত গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের ওপর অবৈধ দখল নিয়েছে এবং তহবিল গঠনের শর্ত লঙ্ঘন করে সে তহবিলের অর্থ ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। তাতে ভোক্তা অধিকার ও স্বার্থ খর্ব হচ্ছে। অথচ বিইআরসি তার প্রতিকার ও প্রতিরোধে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেনি। ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে এগিয়ে আসেনি।

তেরো.

তথ্য-প্রমাণাদিতে দেখা যায়, ২০০৮ সালের ৩০ জুন জ্বালানি বিভাগ নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের মূল্যহার বৃদ্ধি করে। তাতে বিইআরসি ঘটনা-উত্তর অনুমোদন দেয় এবং সেসঙ্গে জ্বালানি বিভাগকে অবহিত করে যে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের বিক্রয় মূল্যহার নির্ধারণের একক এবং একমাত্র এখতিয়ার বিইআরসির। 

পরবর্তীতে জ্বালানি বিভাগ বিইআরসির আগাম সম্মতি নিয়ে তেলের মূল্যহার হ্রাসও করে। ওই বছর ১৫ অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় বিইআরসি-আইনের কতিপয় ধারা সংশোধনীর প্রস্তাব গৃহীত হয়। জ্বালানি তেল ও সিএনজির মূল্যহার নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির পরিবর্তে সরকার তথা জ্বালানি বিভাগের, এ প্রস্তাবটি ছিল তার মধ্যে অন্যতম। ওই আইন এ প্রস্তাব মতে সংশোধন হয়নি।

অথচ জ্বালানি বিভাগ নির্বাহী আদেশে একদিকে এককভাবে জ্বালানি তেল ও সিএনজির মূল্যহার নির্ধারণ করে চলেছে, অন্যদিকে  বিইআরসি আইনি দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে নির্বাসিত হয়ে নির্বিকার রয়েছে।

ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডিন ও অধ্যাপক। 

সূত্র: বণিক বার্তা।

সম্পাদক: আমিনূর রহমান
@ সর্বস্বত্ব এনার্জিনিউজবিডি ডটকম ২০১৫-২০১৯