নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে পারে ভবিষ্যত সঙ্কট মোকাবেলায় নতুন হাতিয়ার  

    হাসান কামরুল
    প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০১৬ মঙ্গলবার ১০:৩০ পিএম BdST     ক্যাটাগরি: মতামত

গ্রামীণ অর্থনীতিতে জ্বালানিই মুল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেমোট দেশজ উৎপাদনের পিছনে জ্বালানির সহজলভ্যতার রয়েছে অগ্রণী ভূমিকা

বাংলাদেশের জনপদে জ্বালানির চাহিদা ও প্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। প্রাকৃতিক গ্যাসের রয়েছে সামষ্টিক সীমাবদ্ধতা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসই জ্বালানি ব্যবস্থার মূল উপাদান হিসেবে বিবেচ্য।

আর এ সীমাবদ্ধতা প্রকট হবে যদি বিদ্যমান গ্যাসের মজুদ ২০২০ সালের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যায় কিংবা নতুন কোন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা না গেলে বাংলাদেশকে প্রচলিত চাহিদা মিটাতে আমদানি নির্ভর হতে হয়।

তাই এ সমস্যা বা সঙ্কটকে মোকাবেলা করতে হলে বিকল্প জ্বালানির উৎস অনুসন্ধান অনস্বীকার্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে পারে ভবিষ্যত সঙ্কট মোকাবেলায় নতুন হাতিয়ার।

প্রচলিত জ্বালানি ব্যবস্থার প্রায় ২৪শতাংশই আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। যদিও সরকার ইতিমধ্যেই ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

কিন্তু বাস্তবিক অর্থে ৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে। যার ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট আসছে সরকারিভাবে আর বাকি ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপন্ন হচ্ছে বেসরকারি পর্যায়ে।

যা আনুপাতিক হিসেবে সরকারিভাবে ৪৭ শতাংশ ও বেসরকারি পর্যায় থেকে ৫৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে। তবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এখনো চাহিদা পূরণে অসমর্থই রয়ে গেছে।

বায়ো, সোলার, বায়ুশক্তি, টাইডাল পাওয়ার ও হাইড্রো এখন পৃথিবীজুড়েই ক্রমাগতভাবেই জনপ্রিয় হচ্ছে। এ ধরনের প্রকল্প থেকে বাংলাদেশেও সহজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। যার জন্য প্রয়োজন সরকারের আন্তরিকতা ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

বায়োগ্যাস

বায়োগ্যাস মূলত মিথেন (৬০-৭০শতাংশ) ও কার্বন ডাই অক্সাইড (৪০-৩০শতাংশ) উপাদানে মিশ্রিত। বাংলাদেশে বায়োগ্যাসের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল জনগোষ্ঠির গ্রামীণ জনপদ।

আর এ জনপদে রয়েছে গৃহপালিত গবাদি পশু যা থেকে বায়োগ্যাসের মূল উপাদান কাউ-ডাং বা গোবর সংগ্রহ করা যায় অনায়াসে।

এক হিসেবে দেখা গেছে বৃহৎ ৬টি সিটি করর্পোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ৭,৯৬০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এ বর্জ্য রাসায়নিক উপাদানে সমৃদ্ধ যার প্রায় ৭৪ শতাংশ জৈব উপাদান, ৯ শতাংশ পেপার, ৪ শতাংশ প্লাস্টিক, ২ শতাংশ টেক্সটাইল ও কাঠ এবং ১ শতাংশ অন্যান্য উপাদান মিশ্রিত হওয়ায় এ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে অতি সহজেই বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা যায়।

সৌরালোক শক্তি

সৌরশক্তি ব্যবহার সবচেয়ে সহজ ও সস্তা এবং নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব। ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এমন একটি জায়গায় অবস্থিত যেখানে বছরের অধিকাংশ সময়ই সূর্যের আলোর প্রখরতা বিদ্যমান।

বাংলাদেশের প্রতি বর্গমিটার এলাকায় প্রতি ঘন্টায়  প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৬ দশমিক ৫কিলোওয়াট আলোকরশ্মি পরিলক্ষিত।

বছরের মার্চ -এপ্রিল এ দুই মাস সূর্যের আলোর প্রখরতা সবচেয়ে বেশি থাকে এবং ডিসেম্বর ও জানুয়ারি দুই মাস সূর্যের আলোকরশ্মির নিম্মগামিতা বিদ্যমান।

আর বাদ বাকি সময়গুলোতে যে পরিমাণ সূর্যরশ্মি বাংলাদেশে পৌঁছে তা শক্তিতে সঞ্চারিত করা গেলে বিশাল শক্তির উৎসের নিশ্চয়তা প্রদান সম্ভব।

যদিও সোলার প্যানেল স্থাপন এখনো সহজতর করা যায়নি। তবুও সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সংস্থা সোলার এনার্জির কর্মাশিয়াল উৎপাদনে সচেষ্ট রয়েছে।

বায়ুশক্তি

বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরীয় উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১৪ কিমি। মৌসুমি বায়ুর আধিক্য রয়েছে পুরো উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে।

দক্ষিণ/দক্ষিণ পশ্চিম রেখাবরাবর মৌসুমি বায়ু সাধারণত উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে বয়ে যায়। সাধারণত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাতাসের গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩মিটার থেকে ৬ মিটার। এবং বায়ুর গতি সাধারণত ‘ভি’ আকৃতির হয়ে উপকুলীয় অঞ্চলজুড়ে পরিলক্ষিত হয়।

মার্চ মাসে টেকনাফে বাতাসের গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩মিটার যা সেপ্টেম্বরে ২০মিটার। একইভাবে কুয়াকাটা, মংলা, কুতুবদিয়া,সন্দীপ ও সেন্টমার্টিন এলাকায় মার্চে বাতাসের গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ থেকে ৫ মিটার ও সেপ্টেম্বরে ২৬ থেকে ৮০ মিটার প্রতি সেকেন্ডে।

এ ধরনের বাতাসের গতিতে অতি সহজেই ছোট ছোট বায়ুকল গড়ে তোলা যেতে পারে। কুতুবদিয়ায় অবস্থিত বায়ুকলটিও যথাযথ রক্ষাণাবেক্ষণের অভাবে সঠিকভাবে উৎপাদনে নেই।

টাইডাল পাওয়ার

সমুদ্রতটের উচ্চতার হেরফেরই টাইডাল পাওয়ার উৎপাদনের মুল নিয়ামক। বাংলাদেশে প্রায় ৭১৪কিমি এলাকাজুড়ে সমুদ্র উপকুলীয় অঞ্চল রয়েছে।

কোস্টাল জোন পলিসি অনুসারে ১৯টি উপকূলীয় জেলার মধ্যে ১২টি জেলার রয়েছে সরাসরি সমুদ্র সংযোগ। এসব এলাকাজুড়ে টাইডাল পাওয়ার প্লান্ট গড়ে তোলা যেতে পারে।

ছোট ছোট এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অতি সহজেই উপকুলীয় অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া সম্ভব। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার ফলে সামুদ্রিক ঝড় ও সাইক্লোনের পরিমাণ ও সংখ্যা কমিয়ে আনা সহজ এবং উপকুলীয়বাসীদের জানমাল রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

আইলার মতো সামুদ্রিক দুর্যোগের পর সরকারিভাবে উপকুলীয় অঞ্চলে বাধ, ব্যারেজ ও স্লুইজগেইট নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব ইনফ্রাস্ট্রাকচারকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যবহার করে ২ থেকে ৮ মিটার টাইডাল হেড থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে।

এধরনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নবায়নযোগ্য। প্রয়োজন অনুযায়ী, এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সহজে বন্ধ করা ও স্থান্তান্তর করা সহজ বিধায়  আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নেই বললেই চলে।

সমুদ্রের এ প্রাকৃতিক শক্তিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে একদিকে যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানির অফুরন্ত দ্বার উম্মোচন হবে অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের জনপদকে নিরাপদ ও আধুনিক জীবন উপহার দেয়া সম্ভব।

জলবিদ্যুৎ

বাংলাদেশ ছোট বড় হাজারো নদীর দেশ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমতট ভূমি। পদ্মা মেঘনা যমুনার প্রবাহের উপর নির্ভরশীল এখানকার জনজীবন।

এতো বেশি স্বাদু পানির উৎস পৃথিবীর খুব কম জায়গায়ই দেখা যায়। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার উৎস প্রবাহ পুরো দেশকে পুর্ব-পশ্চিম কোনে বিভক্ত করেছে।

যা থেকে প্রতিবছর ১দশমিক ৭৩ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার পানি প্রবাহ দেশজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করে। ৫৭টিরও বেশি ট্রান্সবাউন্ডারি নদী রয়েছে।

এসব নদীর উৎস ভারত ও মিয়ানমার থেকে। মৌসুমি বায়ুর আধিক্যকালে এসব নদীতে পানির প্রবাহ অতি উচ্চ হওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের এক অবারিত সুযোগ রয়েছে।

নদী ভিত্তিক জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এখনো পর্যন্ত গড়ে উঠেনি। তবে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পাহাড়ি উৎস থেকে আসা জলের উপর নির্ভরশীল। যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট। তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সম্প্রতি এ কেন্দ্রটির ৫টি উইংসকে শক্তিশালী করার প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

যা থেকে ৩৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে বোর্ড আশা করছে। বাংলাদেশ জুড়েই রয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট নদী  নালা ও পাহাড়ি অঞ্চলে বিদ্যমান ছোট ছোট পানির ঝর্ণা বা ওয়াটার ফলস যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে আগামি কয়েক বছরে জলবিদ্যুৎ থেকে এক হাজার মেগাওয়াটের উপর বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হবে।

এসব ছোট ছোট উৎসকে আমলে নিয়ে চার ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। পিকো হাইড্রোপাওয়ার যা থেকে ৫কিলোওয়াট ঘন্টা, মাইক্রো হাইড্রোপাওয়ার যার থেকে ৫কিলোওয়াট থেকে ৩০০কিলোওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।

মিনি হাইড্রোপাওয়ার থেকে ৩০০কিলোওয়াট থেকে ৩ মেগাওয়াট ও স্মল হাইড্রোপাওয়ার থেকে ১০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ অতি সহজেই উৎপাদন করা সম্ভব।

বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে বিদ্যুতের নিশ্চয়তা প্রদান জরুরি। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার যে কর্মসূচি সরকারের রয়েছে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিকল্প জ্বালানির উৎস অনুসন্ধান জরুরি।

কেননা প্রত্যন্ত অঞ্চলে এধরনের ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে অতি সহজেই সেসব এলাকাকে  বিদ্যুতের আওতায় এনে আলোকিত করা সম্ভব।

যার জন্য খুব বেশি বাজেটের প্রয়োজন পড়বেনা এবং জাতীয় গ্রিডের সম্প্রসারনের প্রয়োজন নেই। তাই বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থায় সরকারকে আরো বেশী মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

হাসান কামরুল, জ্বালানি ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক।

সম্পাদক: আমিনূর রহমান
@ সর্বস্বত্ব এনার্জিনিউজবিডি ডটকম ২০১৫-২০২০