ঢাকা, বুধবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৮, অগ্রহায়ণ ২৭, ১৪২৫ ০২:০৭ এএম
  
হোম এনার্জি বিডি এনার্জি ওয়ার্ল্ড গ্রীণ এনার্জি মতামত সাক্ষাৎকার পরিবেশ বিজনেস অন্যান্য আর্কাইভ
সর্বশেষ >
English Version
   
মতামত
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কতদিন কয়লা সরবরাহ করতে পারবে?
দিনাজপুরে বড়পুকুরিয়ায় বাংলাদেশের একমাত্র কয়লা খনি ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন শুরু করে ২০০৫ সালে। এই কয়লা খনিটি বড়পুকুরিয়ায় অবস্থিত দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক  বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে কয়লার জোগান দিয়ে থাকে। বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কয়লা খনি সংলগ্ন হবার কারণে  দুটি সুবিধা পেয়ে থাকে। প্রথমত, এখানে কয়লা পরিবহনের বাড়তি খরচ নেই এবং দ্বিতীয়ত, কয়লা পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট দূষণ ঘটার আশঙ্কা নেই। সে হিসেবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির অবস্থান আদর্শ। গত জুলাই মাসে এই কয়লাখনি থেকে বিপুল পরিমান কয়লা উধাও বা চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ  উঠে। খনি প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই কয়লা চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করে ১৯ জন খনি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্থানীয় পার্বতীপুর থানায় মামলা করা হয়। আবার একই সঙ্গে খনি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এই কয়লা ঘাটতিকে চুরি নয়, বরং সিস্টেম লস হিসাবে দেখানোর যুক্তি আনতে দেখা যায়। খনি কর্তৃপক্ষের  এই স্ববিরোধী অবস্থান বর্তমানে দায়িত্ব প্রাপ্ত নতুন খনি প্রশাসনকে কিছুটা  বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। কয়লা উধাও হবার কারণ যা-ই হোক না কেন, কয়লা ইয়ার্ড শূন্য হয়ে যাওয়ার ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে কয়লা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।  আর এর ফলে বিদ্য্যুৎ কেন্দ্রাটির উৎপাদন  বন্ধ হয়ে যায় এবং তাতে উত্তরবঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপর্যয় ঘটে।   কয়লা খনিটি প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর  আবার চালু হলে  কয়লা সরবরাহের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও আবার চালু হয়। তবে চাহিদার তুলনায় কয়লার জোগান কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে কম মাত্রায় হয়ে থাকে। একটি বিষয় দৃশ্যমান হয় যে, বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উপর শতভাগ নির্ভরশীল। এই খনি ছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে কয়লা জোগান দেওয়ার জন্য বর্তমানে বা নিকট ভবিষ্যতে দৃশ্যমান কোন দ্বিতীয় দেশীয় উৎস নেই। আবার বড়পুকুরিয়ার কয়লার  মতো  উন্নত মানের কয়লা বিদেশ থেকে আমদানী করে এটিকে চালানো বাস্তব সম্মত নয়, কারণ  সেক্ষেত্রে আমদানী করা কয়লা পরিবহন করে বড়পুকুরিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে কয়লার দাম পড়বে বর্তমানের খনিটির কয়লা মূল্যের দ্বিগুনের বেশী। অপর দিকে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের কয়লা ব্যবহার করলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এ অবস্থায় প্রশ্ন জেগেছে যে, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিটি কতদিন কয়লা সরবরাহ করতে পারবে। কয়লাখনিটির বর্তমান খনন চুক্তি ও কার্যক্রম ২০২১ সালে শেষ হবে। কিন্তু তার পর কী হবে? খনন কার্যক্রমকে আরো অধিক গভীরতায় নিয়ে যাওয়া যাবে কি?   কিংবা বিকল্প পন্থা হিসাবে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে খনি সম্প্রসারণের কোন ব্যবস্থা করা হবে কি? সে লক্ষ্যে খনি অবকাঠামো ২০২১ সাল নাগাদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি ? অন্যথায় কয়লার অভাবে আবার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে দীর্ঘতর বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটবে কি?      বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিটি চীনের আর্থিক ও কারিগরী সহোযোগিতার মাধ্যমে স্থাপন করা হয়। চীনের  সিএমসি কোম্পানী প্রায় ৫ বছরে নির্মাণ কাজ শেষ করে ২০০৫ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরূ করে। মূলত দুটি কারণে কয়লাখনিটি প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা নাজুক প্রকৃতির। একটি হলো কয়লার উপরে একটি পুরু পানিবাহী বালুস্তর, যেটি থেকে প্রচুর পানি প্রায়ই খনির ভেতরে প্রবেশ করে ও কখনো-বা খনিকে অস্থিতিশীল করে তোলে।  দ্বিতীয়ত, কয়লা স্তরের বিরাট পুরুত্ব, যা কিনা এককভাবে কেটে নিয়ে আসা যায় না; বরং তা একাধিক তলে সমান্তরাল স্লাইসে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে কেটে নিয়ে আসতে হয়। বড়পুকুরিয়ায় ৩৬ মিটার পুরু স্তরটিতে  তিন বা চারটি স্লাইস কাটার নকশা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে অনেকটা কয়লা মাটির নীচে থেকে যায় কারণ দুটি স্লাইসের মধ্যবর্তী অংশে কয়লা উত্তোলন করা যায় না। এরকম কয়লা খনির অপর উল্লেখ্য বিযয় হলো, ওপর থেকে নিচের দিকে স্লাইসগুলো খনন করার সময় খনি ক্রমাগত অধিকতর অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ  হয়ে পড়ে। ফলে বর্তমানে খননকৃত তৃতীয় স্লাইস কাটার পর তার নিচে অধিকতর গভীরতায় চতুর্থ স্লাইস কাটা যাবে কি না, তা অনিশ্চিত এবং কাটা সম্ভব হলেও তা কেবল আংশিকভাবে হতে পারে।।  ভূগর্ভস্থ বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কতটা কয়লা উত্তোলন করা যাবে? কয়লা উত্তোলনের জন্য বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানী  চীনের কোম্পানী সিএমসি-এক্সএমসি কনসোর্টিয়াম এর সাথে ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন চুক্তি করে। এই কয়লা খনিতে মোট কয়লার মজুদ  প্রায় ৩০ কোটি টন, যা কিনা প্রায় ৬৫০ হেক্টর এলাকাব্যাপী বিস্তৃত।  এলাকাটিকে তিনটি অংশে ভাগ করা হয়, তথা উত্তর এলাকা ( ২৭০ হ্ক্টের), মধ্য এলাকা (৩০০ হেক্টর) ও দক্ষিণ এলাকা (৮০ হেক্টর)। বর্তমানে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিটি  কেবল মধ্য এলাকাতেই সীমাবদ্ধ,  কারণ কয়লা খনন ও উৎপাদন করার জন্য কেবল এখানেই খনির অবকাঠামো তৈরী করা হয়েছে। চীনা কোম্পানী পর্যায়ক্রমে কয়েকটি চুক্তির  অধীনে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে এখান থেকে মোট কয়লা উৎপাদন করেছে প্রায় ১ কোটি ১ লক্ষ টন, যা কিনা বড়পুকুরিয়ায় মোট কয়লা মজুদের  ৫ শতাংশের কম। বর্তমানে চীনা কোম্পানীটির সঙ্গে সর্বশেষ একটি ৪ বছর মেয়াদী (২০১৭-২০২১) চুক্তির অধীনে তৃতীয় স্লাইস থেকে কয়লা উৎপাদন চালু রয়েছে। এই চুক্তির অধীনে কয়লা উত্তোলন ২০২১ সালে শেষ হবার পর আরও নিচে ৪র্থ স্লাইস থেকে কয়লা উৎপাদন অনিশ্চিত কিংবা সম্ভব নয় বলে মনে করা হয়। তাই  ২০২১ সালের পর  উত্তর এলাকা ও দক্ষিণ এলাকা থেকে কয়লা উত্তোলনই কয়লা সরবরাহ চালিয়ে যাবার একমাত্র উপায়। বর্তমানে বড়পুকুরিয়ায়  উত্তর এলাকা ও দক্ষিণ এলাকায় কোন খনি কার্যক্রম নাই বা কোনো বাস্তব খনন প্রকল্প দৃশ্যমান নয়। সম্প্রতি একটি বিদেশী খনি পরামর্শক  অষ্ট্রেলিয়ার জন বয়েড কোম্পানী বড়পুকুরিয়ার উত্তর ও দক্ষিণ এলাকা থেকে ভূগর্ভস্থ উপায়ে কয়লা খনন ও উত্তোলনের সম্ভাব্যতা জরিপ শেষে তার রিপোর্ট পেশ করেছে। খনি পরামর্শক কোম্পানীর মতে, দক্ষিণ এলাকা থেকে ভূগর্ভস্থ  পদ্ধতিতে ১০ বছরে মোট ১ কোটি টন (অর্থাৎ প্রতি বছরে ১০ লক্ষ টন) কয়লা উত্তোলন করা যেতে পারে। আর উত্তর এলাকা থেকে ১০ বছরে মোট প্রায় ৫০ লক্ষ টন কয়লা অর্থাৎ বছরে প্রায় ৫ লক্ষ টন কয়লা উত্তোলন করা যাবে। অর্থাৎ ১০ বছর পর্যন্ত  উত্তর ও দক্ষিণ এলাকা দুটি থেকে ভূগর্ভস্থ  পদ্ধতিতে বছরে মোট  ১৫ লাখ টন কয়লা সরবরাহ করা সম্ভব।  বড়পুকুরিয়ায় খনি সংলগ্ন  ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন কয়লার প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে ২০২১ সনে বর্তমানে চলমান  মধ্য এলাকায় কয়লা উৎপাদন শেষ হয়ে গেলেও পরবর্তী আরো ১০ বছর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ন্যূনতম কয়লা চাহিদা মেটানো যেতে পারে, যদি উত্তর ও দক্ষিণ এলাকা দুটি খননের আওতায় আনা হয়।  কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে, উত্তর ও দক্ষিণ এলাকায় কয়লা খনন প্রক্রিয়া চালানোর কোনো  প্রকল্প এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। এই এলাকা দুটিতে কয়লা খনন শুরূ করার জন্য খনির অবকাঠামো তৈরী করতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগবে। সুতরাং ২০২১ সালে এখান থেকে কয়লা সরবরাহ করতে হলে এবছরই সেখানে খনন অবকাঠামো তৈরীর কাজ শুরু করতে হবে। সময় থাকতে কাজ শুরু না করলে বর্তমানের মত কয়লা সংকটের আবর্তে পড়ে আবার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গিয়ে উত্তরবঙ্গে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট ঘটুক তা কারও কাম্য নয়।  এ ক্ষেত্রে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানীর কার্যকর পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করা হয়। বড়পুকুরিয়া ভূগর্ভস্থ কয়লা খনিটি মোট মজুদ কয়লার কেবল ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ কয়লা  উত্তোলন করতে পারবে বলে খনি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। একটি বিরাট অংশ কয়লা ভূগর্ভ থেকে আহরণ করা যাবে না, যদি তা উম্মূক্ত খনন পদ্ধতি অবলম্বন করা না হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মত একটি ঘনবসতি ও উর্বর সমতল অঞ্চলে উম্মুক্ত খনন পদ্ধতি  সামাজিক ও ভৌগলিক প্রেক্ষাপটে  গ্রহনযোগ্য  হবে কিনা তা নিয়ে বড় রকমের  বিতর্ক রয়ে গেছে।  এ নিয়ে অতীতে সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনায় বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনকেও জড়িয়ে ফেলেছে। বড়পুকুরিয়ায় উম্মূক্ত খনন পদ্ধতিতে ৯০ শতাংশ কয়লা  উত্তোলন সম্ভব বটে, কিন্তু তার সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক উপাদানগুলোর স্বরূপ  জটিল বটে। সর্বোপরি ওই এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণের এতে সম্মতি আছে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে সেখানে এ পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা।   অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র: প্রথম আলো  
‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র: সমৃদ্ধ বাংলাদেশের সোপান’
জুলাই ০২, ২০১৮ সোমবার ০৫:১৭ পিএম - মোঃ আনোয়ার হোসেন
বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশসমূহের মধ্যে অন্যতম। গত ১০ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬% এর উপরে রয়েছে; গত ৩ বছরে এই প্রবৃদ্ধির হার ৭% ছাড়িয়েছে। এই দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে বিদ্যুতের চাহিদাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। সম্প্রতি বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের সোপানে পদার্পণ করেছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত হতে হলে প্রায় ৬০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে আমাদের; যেখানে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা হলো প্রায় ১৬,৫০০ মেগাওয়াট। দেশের মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমানে প্রায় ৪৩৩ কিলোওয়াটআওয়ার। উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করতে হলে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০২১ সালের মধ্যে ন্যূনতম ৫৪০ কিলোওয়াটআওয়ার, ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০০ কিলোওয়াটআওয়ার এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১,৫০০ কিলোওয়াটআওয়ারে বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রধানত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের উপর নির্ভরশীল। দেশে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে এবং পুরনো গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি না পেলে ভবিষ্যতে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভবপর হবে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদার আলোকে বর্তমান সরকার ২০১০ সালে পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্লান হালনাগাদ করে। পরবর্তীতে ২০৪১ সালের কান্ট্রি ভিশনকে অন্তর্ভুক্ত করে ২০১৬ সালে পুনরায় পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্লান হালনাগাদ করা হয়। যেখানে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে একক জ্বালানির উপর নির্ভরতা হ্রাস করে বহুমুখী জ্বালানি ব্যবহারকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। হালনাগাদকৃত পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্লান-এর প্রধান নীতিগুলো নিম্নরূপ:  * দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি  * বিদ্যুৎ উৎপাদনে বহুমুখী জ্বালানির ব্যবহার  * বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস হিসেবে কয়লাকে চিহ্নিতকরণ  * বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার  * বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ পরিবহণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় অপচয় রোধ  * প্রতিবেশি দেশসমূহ হতে বিদ্যুৎ আমদানি  উপর্যুক্ত নীতিগুলোর মধ্যে পরমাণু শক্তি হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন অন্যতম। পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, মূল্য সাশ্রয়ী এবং পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি মিশ্রণে পারমাণবিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্বন, সালফার ও নাইট্রোজেন যৌগ নিঃসরণ হয় না। নতুন প্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট অতীতের প্ল্যান্ট থেকে অনেক বেশী দীর্ঘস্থায়ী এবং টেকসই। এক গ্রাম ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করে প্রায় ২৪,০০০ কিলোওয়াটআওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব যেখানে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রায় ৩ মেট্রিক টন কয়লা প্রয়োজন হয়। তাছাড়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা ব্যয় যে কোন জীবাশ্ম জ্বালানির প্ল্যান্টের চেয়ে অধিক সাশ্রয়ী। অধিকাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের আয়ুষ্কাল ৬০ বছর এবং পরবর্তীতে তা ৮০ বছর পর্যন্ত বর্ধিত করা যায়। যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ ২৫ বছর। আমাদের দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৬১ সালে। সে লক্ষ্যে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে এ প্রকল্পের জন্য প্রায় ২৬০ একর এবং আবাসিক এলাকার জন্য ৩২ একর জমি অধিগ্রহণপূর্বক অফিস ভবন, রেস্ট হাউজ এবং বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন নির্মাণসহ ৭২টি আবাসিক ইউনিটের নির্মাণ কাজ আংশিকভাবে সম্পন্ন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ১৯৬৩-৬৯ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন লাভ করে। কিন্তু তৎকালীন সরকার বাঙালি জাতির প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে প্রকল্পটিকে পাকিস্তানের করাচীতে স্থানান্তর করে। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তৎকালীন পাকিস্তানের যে সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সেখানে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে জয়লাভের পর ১৯৭১ সালের ০৩ জানুয়ারি নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যবৃন্দের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ১১টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে ১০নং প্রতিশ্রুতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে প্রথম ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কারণে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাস্তবায়ন অন্ধকারে হারিয়ে যায়।  ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং জাতীয় জ্বালানি নীতি, ১৯৯৬-এ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করে। ১৬ অক্টোবর ১৯৯৭ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সংক্রান্ত একটি সভায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০০০ সালে সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার পাওয়ার অ্যাকশন প্লান(বিএএনপিএপি)অনুমোদিত হয়। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের নির্বাচনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালে সরকার “ভিশন-২০২১” বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে। এ ভিশন বাস্তবায়নের নিমিত্ত সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ২৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে পরিকল্পনা গ্রহণ করে। উক্ত পরিকল্পনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ০২ নভেম্বর ২০১১ তারিখে রূপপুরে দুই ইউনিট বিশিষ্ট ভিভিইআর-১২০০ শ্রেণির পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নিমিত্ত রাশান ফেডারেশন এবং বাংলাদেশের মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ০২ অক্টোবর ২০১৩ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ১৮ আগস্ট ২০১৫ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানী বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)গঠন করা হয়। ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মূল পর্যায়ের কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য জেনারেল কন্ট্রাক্ট ফর রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কনস্ট্রাকশন স্বাক্ষরিত হয়। ০৬ ডিসেম্বর ২০১৬ সরকার ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন করে। ০৩ জুলাই ২০১৭ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক ইউকিয়া আমানো রূপপুর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন এবং প্রকল্পের অগ্রগতিতে এই মর্মে সন্তোষ প্রকাশ করেন যে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সঠিক পথে এগুচ্ছে এবং বাংলাদেশে উচ্চমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশিষ্ট পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। ৩০ আগস্ট ২০১৭ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পেন্ট নিউক্লিয়ার ফুয়েল ফেরত নেওয়ার বিষয়ে রাশান ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে অপর একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ০৪ নভেম্বর ২০১৭ বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশন লাইসেন্স ইস্যূ করা হয় এবং ৩০ নভেম্বর ২০১৭ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম কংক্রিট ঢালাইয়ের শুভ উদ্বোধন করেন। ইতোমধ্যে প্রথম ইউনিটের ফাউন্ডেশনের কংক্রীট ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের কংক্রীট ঢালাইয়ের কাজ শীঘ্রই শুরু করা হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পারমাণবিক নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্প দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সকল বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করে এবং আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুসরণ করেই বাস্তবায়িত হচ্ছে। এক্ষেত্রে মানব সম্পদ উন্নয়ন থেকে শুরু করে রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশের ভারসাম্য সংরক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এজন্য বিগত ১০০ বছরের বন্যার ইতিহাস পর্যালোচনা করে রিঅ্যাক্টরের স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। নির্মাণাধীন রিঅ্যাক্টর ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল হবে। জাপানের ফুকুসিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনার পর যেসব প্রতিকার ও প্রতিরোধের বিষয়গুলো উঠে এসেছে তা বিবেচনায় নিয়ে রূপপুরের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ডিজাইন করা হচ্ছে। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ শ্রেণির জেনারেশন ৩+রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। উক্ত রিঅ্যাক্টরে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকবে যাতে কোনক্রমেই তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়িয়ে পড়বে না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে একটি বেইজলোড সাশ্রয়ী মূল্যের বিদ্যুৎ কেন্দ্র যা ২৪ ঘন্টা চলবে। এ কেন্দ্রটি চালু হলে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। ফলে কলকারখানা এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গতিশীল হবে। এতে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি বাড়বে। প্রকল্পটি এসডিজি-৭ অর্থাৎ “অ্যাকসেস টু অ্যাফরডএবল, রিলাইএবল, সাসটেইনএবল অ্যান্ড মডার্ণ এনার্জি ফর অল” অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে এবং দারিদ্র বিমোচনে সহায়ক হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।  রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান ও মনিটরিং এর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি রয়েছে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিতভাবে তদারকি, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ও কারিগরি বিষয়াদি পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি কারিগরি কমিটি রয়েছে। এছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কের নেতৃত্বে একটি মনিটরিং কমিটি রয়েছে, যা প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করছে। উপরন্তু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কার্যাবলী চিহ্নিতকরণ ও সম্পাদনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে ১টি ওয়ার্কিং গ্রুপ ও ৮টি সাব-ওয়ার্কিং গ্রুপ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার এক্সপার্ট মিশন নিয়মিতভাবে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করছে এবং প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে পরামর্শ প্রদান করছে। সংশ্লিষ্ট সকলের সার্বিক সহযোগিতায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে রাশান ফেডারেশনের নিউক্লিয়ার পাওয়ার রিঅ্যাক্টরের যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য লং টার্ম ম্যানুফেকচারিং ইকুপমেন্ট-এর উৎপাদন শুরু করেছে। পাওয়ার গ্রীড কোম্পানী বাংলাদেশ লিমিটেড রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত করার জন্য ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায় নিয়োজিত জনবলের আবাসনের ব্যবস্থা করতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে গ্রীন সিটি নির্মাণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ রূপপুর প্রকল্পের যন্ত্রপাতি এবং আনুষঙ্গিক মালামাল প্রকল্প এলাকায় পরিবহণের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের কাজ করছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন ধাপে প্রায় ৩,০০০ জনবল নিয়োগ করা হবে। রাশান ঠিকাদারের সাথে স্বাক্ষরিত জেনারেল কন্ট্রাক্ট-এর আওতায় ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৪২৪ জনকে জব পজিশন এবং জব ফাংশন এর ভিত্তিতে ও আন্তর্জাতিক মানদন্ডের নিরিখে বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রাশান ফেডারেশনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উল্লিখিত জনবল কমিশনিং পর্যায় থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন। অবশিষ্ট জনবলকে বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এছাড়া দক্ষমানব সম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে মস্কো ইঞ্জিনিয়ারিং ফিজিক্স ইনস্টিটিউট (মেফি)- এ নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য সরকারের বিশেষ বৃত্তির আওতায় ৬০ জন শিক্ষার্থীকে রাশান ফেডারেশনে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রেরিত শিক্ষার্থীদের প্রথম ব্যাচ উচ্চ শিক্ষা শেষে সেপ্টেম্বর ২০১৮-এ দেশে ফিরবে এবং সরাসরি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যোগদান করবে। ২০২২ সাল পর্যন্ত এ উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ওয়ার্ক প্লান(আইডব্লিউপি)-এর আওতায় বিভিন্ন বিষয়ে স্বল্প মেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে সহযোগিতা করে আসছে। এ প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের নিমিত্ত রাশান ফেডারেশনের পাশাপাশি একই টেকনোলজি ব্যবহার করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিবেশী দেশ ভারতও সহযোগিতা করছে। ভারত ইতোমধ্যে আমাদের ৮৮ জন কারিগরি কর্মকর্তাকে ফাউন্ডেশন কোর্স অন নিউক্লিয়ার এনার্জি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। আরও ৫৫ জন এপ্রিল ২০১৮-এর প্রথমার্ধে উক্ত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য ভারত গমন করেছে। একই সাথে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন মাফিক ভারতের পরামর্শক সেবা গ্রহণ করা হচ্ছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ৩ বছর মেয়াদী কমিউনেকেশন প্লান প্রণয়ন করা হয়েছে। ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটারে নিউক্লিয়ার ইনফরমেশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। রূপপুরে স্থানীয় জনগণের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সদস্যবৃন্দ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি সরেজমিনে পরিদর্শন করছেন এবং রাশান ফেডারেশনে অনুরূপ কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। দেশব্যাপী অনুষ্ঠেয় বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিজ্ঞান মেলায় পরমাণু বিদ্যুৎ সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা হচ্ছে এবং এ সংক্রান্ত লিফলেট, বুকলেট ইত্যাদি বিতরণ করা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ প্রকল্প এলাকা ও উন্নত দেশের অনুরূপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। তাঁরাও পরমাণু বিদ্যুৎ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন। বর্তমানে পৃথিবীতে ৩০টি দেশে ৪৪৭টি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের মাধ্যমে ৩,৯১,৯১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা পৃথিবীর মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের শতকরা ১১ ভাগ এবং স্বল্প-কার্বন বিদ্যুতের শতকরা ৩০ ভাগ। বাংলাদেশ ব্যতীত ১৫টি দেশে ৫৯,৯১৭ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৬০টি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর স্থাপন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং আরও ৭টি দেশে ৮৮টি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। গত ৩০ বছরে নতুন কোন দেশ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করতে পারেনি। বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গর্বিত মালিক হতে যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং গর্বের বিষয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব নিউক্লিয়ার ক্লাবে সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এটি একটি ঐতিহাসিক ও অনন্য অর্জন, যা বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে একটি ভিন্ন মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। আশা করা যায় আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট হতে ১২০০ মেগাওয়াট এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিট হতে আরো ১২০০ মেগাওয়াট মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক হবে।     মোঃ আনোয়ার হোসেন, সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।
ক্যাটাগরি: মতামত
‘বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়নে পথপ্রদর্শক হতে পারে জার্মানি’
ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮ সোমবার ০৮:১৭ এএম - ড. এম শামসুল আলম
বিশ্ব উন্নয়নের কক্ষপথে। সে উন্নয়নে জ্বালানি চাহিদা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ বজায় রাখতে নানা দেশে নানাভাবে জ্বালানি খাতে নানা রকম সংস্কার বা রূপান্তর চলছে। অর্থাৎ জ্বালানি খাত উন্নয়ন হচ্ছে। সে উন্নয়নের প্রকার ও প্রকৃতি পর্যালোচনায় এ প্রবন্ধে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এবং উন্নত দেশ হিসেবে জার্মানিকে বেছে নেয়া হয়েছে। আর্থিক প্রবৃদ্ধির দর্শনে বিশ্ব এখন দুই ধারায় বিভক্ত: (ক) জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধিতে জিডিপি বৃদ্ধি পায়। আবার জিডিপি বৃদ্ধি হলে জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি হয়। এভাবে চক্রাকারে উভয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। (খ) জিডিপির অব্যাহত বৃদ্ধিতে জ্বালানি ব্যবহার হ্রাস অব্যাহত থাকে। জার্মানিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্বারা কার্বনযুক্ত জ্বালানি প্রতিস্থাপন ও জ্বালানির ব্যবহার কমানোর কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রতি বছর ব্যয় হয় ২ হাজার ৬০০ কোটি ইউরো (জিডিপির ১২ শতাংশ)। জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি দ্বারা আর্থিক প্রবৃদ্ধি নয়, আর্থিক প্রবৃদ্ধি দ্বারা জ্বালানি ব্যবহার হ্রাসই জার্মানির উন্নয়ন দর্শন। বাংলাদেশের আয়তন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ১৬০ মিলিয়ন। বাংলাদেশের মতো এত বেশি ঘন জনবসতির দেশ বিশ্বে বিরল। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত। কৃষিনির্ভর। সিংহভাগ বিদেশী মুদ্রা আসে অদক্ষ শ্রমশক্তি ও তৈরি পোশাক রফতানি থেকে। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৫০০ ডলার। প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ। গড় আয়ু ৭০ বছর। উন্নয়নের এমন ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের পক্ষে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়। তবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে আছে। ফলে আর্থিক প্রবৃদ্ধির ওই ধারা এখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তাই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলা করা এখন দেশটির জন্য জরুরি। সে সংকট মোকাবেলায় চলতি অর্থবছরে ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ দশমিক ২ হাজার মেগাওয়াট তেলবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা জরুরি ভিত্তিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে ১ হাজার এমএমসিএফডি এলএনজিও আমদানি হচ্ছে। সংকট মোকাবেলায় তেল ও এলএনজি আমদানি বাড়ছে। নিজস্ব কয়লা উত্তোলন এবং জলস্থলের গ্যাস অনুসন্ধান গুরুত্ব পাচ্ছে না। বাংলাদেশে জ্বালানি সংস্কারের (রূপান্তর) লক্ষ্য: এ খাত উন্নয়নে (ক) প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা (খ) ব্যক্তি খাত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং (গ) ভোক্তাদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে— (ক) একীভূত বা সমন্বিত ইউটিলিটি বিভাজিত হয়েছে (খ) বিভাজিত ইউটিলিটিগুলো বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে এবং (গ) স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রেগুলেটরি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনায় প্রদর্শিত পথে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন না হওয়ায় চাহিদামাফিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়নি। ফলে সংকট মোকাবেলা করা যায়নি। পলিসি ও পরিকল্পনা উপেক্ষা করে বছরের পর বছর ধরে জরুরি বিবেচনায় অ্যাডহকভিত্তিক ব্যবস্থাদির আওতায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা হচ্ছে। নতুন আইন (বিশেষ বিধান) দ্বারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন প্রতিযোগিতা মুক্ত করা হয়েছে। তাই এ খাত সংস্করণ বা রূপান্তরণ ফলপ্রসূ হয়নি। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হলেও সাগরের গ্যাস গ্রিডে আসেনি। সে গ্যাস অনুসন্ধানেও নামা হয়নি। মজুদ বৃদ্ধি ব্যতীত স্থলভাগের গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি জ্বালানি সংকটকে ঘনীভূত করেছে। কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ গৃহীত হলেও সে বিদ্যুৎ গ্রিডে আসেনি। অথচ জ্বালানি মিশ্রে তরল জ্বালানি (তেল) কমানোর পরিবর্তে ক্রমাগত বৃদ্ধি দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাস তথা জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় তরল জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি অব্যাহত। ফলে আসন্ন গ্রীষ্মে ব্যয়বহুল তেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ হতে পারে মোট বিদ্যুতের ৪০ শতাংশের বেশি। পাশাপাশি এলএনজি মিশ্রিত গ্যাস থেকে বিদ্যুৎও ব্যয়বহুল হবে। অর্থাৎ স্বল্পতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতি ও কৌশল অকার্যকর। আবার মেরিট অর্ডার লোড ডিসপ্যাচ নীতিও অচল। সর্বোপরি বিদ্যমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন নীতি ও কৌশল মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে বড় বাধা এবং ভাবনার বিষয়। ‘সবার জন্য বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি পলিসি বিভ্রান্তির শিকার। তাই এ কর্মসূচি ব্যয়বহুল হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে আর্থিক ঘাটতি অতিমাত্রায় বেড়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ খাতকে বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করা কঠিন। অথচ বাণিজ্যিক বিবেচনায় গ্রিড সম্প্রসারণ এবং ফসিল ফুয়েল (কার্বনযুক্ত জ্বালানি) বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল গ্রহণের পাশাপাশি সমন্বিতভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল গৃহীত হয়নি; হলে একদিকে সৌরবিদ্যুতের বাজার সম্প্রসারণ হতো, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাত আর্থিক ঘাটতির শিকার হতো না। বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলা করা সহজ হতো। জ্বালানির দরপতন সুবিধাবঞ্চিত ভোক্তাদের বিদ্যুতের মূল্যহার বারবার বেশি বেশি বৃদ্ধির অভিঘাতও সইতে হতো না। বাস্তবে সৌরবিদ্যুৎ উন্নয়ন কার্যক্রম সীমাবদ্ধতা ও বিচ্ছিন্নতার শিকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ চেইনকে সংস্কার কর্মসূচির আওতায় নানা সেগমেন্টে বিভাজন এবং সেই সঙ্গে বাণিজ্যিকীকরণও করা হয়েছে। তবু কোনো সেগমেন্টই বিনিয়োগকারীর জন্য স্বচ্ছ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হিসেবে উপযোগী হয়নি। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা না থাকায় সুষম বিনিয়োগ হয়নি এবং বিনিয়োগ সংকটও নিরসন হয়নি। চাহিদামাফিক দক্ষ ও উপযুক্ত জনবল সৃষ্টি হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার ও বৃদ্ধি জ্বালানি সরবরাহ ও বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। পিক ও বেজ লোড বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার অনুপাতও সামঞ্জস্যহীন। বর্তমানে পিক লোড বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা মোট উৎপাদনক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ। ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা হিসেবে ধরা হলে এ অনুপাত আরো বেশি হতো। তাছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ক্ষমতা এবং এসব সেগমেন্টের সক্ষমতা ব্যবহার ও বৃদ্ধি যৌক্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি এখন নিয়ন্ত্রণহীন। হিসাবে দেখা যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি পায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৩ হাজার কোটি টাকা। প্রতিযোগিতার অভাবে যে অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি, তা এ হিসাবে আসেনি। পলিসি (আপ স্ট্রিম) রেগুলেটর হিসেবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উভয় বিভাগই স্বার্থ-সংঘাতমুক্ত নয়। তারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ইউটিলিটি পরিচালনায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। ফলে ডাউন স্ট্রিম রেগুলেটর হিসেবে বিইআরসি এসব ইউটিলিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ করে জ্বালানি বিভাগ। আবার এলপিজির ক্ষেত্রে সে মূল্যহার নির্ধারণ করেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা। অথচ ওই উভয় মূল্যহার নির্ধারণের আইনি এখতিয়ার কেবল বিইআরসির, অন্য কারো নয়। বিইআরসি মূলত অকার্যকর হয়েছে এভাবেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সুশাসন সংকট ও অস্বচ্ছতার শিকার। তাই এ খাতে ভোক্তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়নি। প্রতিযোগিতাও সৃষ্টি হয়নি। মানসম্মত ব্যক্তি বিনিয়োগ অপ্রতুল। সরকারি বিনিয়োগও অপর্যাপ্ত এবং সামঞ্জস্যহীন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণহীন। ফলে ভোক্তা বা জনস্বার্থ সুরক্ষা অনিশ্চিত। কার্যত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সংস্কার সফল হয়নি। তেল ও কয়লার দরপতন যৌক্তিক সমন্বয় না হওয়ায় সে সুবিধা জনগণ একদিকে পায়নি, অন্যদিকে যৌক্তিক ও ন্যয়সঙ্গত না হওয়া সত্ত্বেও বারবার বেশি বেশি গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১ ডিসেম্বর থেকে বিদ্যুতের মূল্যহার আবারো বাড়ানো হয়েছে। মোট বিদ্যুতের (৬১ বিলিয়ন ইউনিট) প্রায় ৪৬ শতাংশ ব্যবহার হয় আরইবির আওতায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পিবিএস)গুলোয়। ওই আদেশ মতে, পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যহার এখন ভারিত গড়ে ৪ দশমিক ৮৪ টাকা। অর্থাৎ আগের মূল্যহার অপেক্ষা ৬ পয়সা কম। ফলে পাইকারি বিদ্যুতে ঘাটতি থাকে ৭১ পয়সা (প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা)। সে ঘাটতি বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলে অনুদানের হার (১১ পয়সা) কমিয়ে এবং সরকারি সাবসিডি (৬০ পয়সা) দিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে। অন্যদিকে আগের মূল্যহার অপেক্ষা পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যহার কমানো হয়েছে আরইবির জন্য ১৭ দশমিক ২ পয়সা। নেসকোর জন্য ৬২ দশমিক ২ পয়সা। অথচ বিতরণে আর্থিক ঘাটতি ২ হাজার ৭৮ কোটি টাকার সমন্বয়ে গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যহার বেড়েছে ৩৫ পয়সা। এসব তথ্যাদিতে প্রতীয়মান হয়, বিদ্যুৎ বিতরণ ইউটিলিটি একদিকে আর্থিক সক্ষমতা, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা হারাচ্ছে। বাংলাদেশে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির বিপরীতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ। প্রায় দেড় গুণ। ভারতে শূন্য দশমিক ২০ গুণ। চীনে শূন্য দশমিক ৫৯ গুণ। অন্যান্য অগ্রগামী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সামঞ্জস্যহীন। এ মানদণ্ডে জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন হতাশাব্যঞ্জক। জার্মানির ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৯৯০ সাল থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার তথা বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। অথচ জিডিপি বেড়েই চলেছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হলেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধনাত্মক। জার্মানির এ দৃষ্টান্ত জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে জার্মানি কতটা সফল, তারই প্রমাণ। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সে সফলতা দৃশ্যমান নয়; বরং জিডিপি ও বিদ্যুৎ উভয় প্রবৃদ্ধি ভিন্ন কথা বলে। জ্বালানি বা বিদ্যুৎ খাত সংস্করণে (রূপান্তরণ) বাংলাদেশ যে চরম ব্যর্থতার শিকার, তা আর বলার অপেক্ষায় নেই। জার্মানির আয়তন ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৭৬ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে জনসংখ্যা ৮২ মিলিয়ন। বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৪১ হাজার ৯৩৬ ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৯ শতাংশ। গড় আয়ু ৮১ দশমিক শূন্য ৯ বছর। জ্বালানিতে স্বনির্ভর নয়। অর্থনীতি শিল্পনির্ভর। কার্বনমুক্ত অর্থনীতি বিনির্মাণের লক্ষ্যে জ্বালানি রূপান্তরণের আওতায় জার্মানিতে: (ক) নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন হচ্ছে (খ) জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে নতুন নতুন মেশিন, যন্ত্রপাতি, উপকরণ, হাতিয়ার ইত্যাদি উদ্ভাবন, তৈরি, স্থাপন, প্রতিস্থাপন ও বাজারজাত করা হচ্ছে (গ) তাপরোধী ভবন এবং বিদ্যুৎ চালিত বাহন বাড়ছে এবং (ঘ) জনগণের অভিপ্রায়, মনোভাব, চালচলন, অভ্যাস ইত্যাদি পরিবর্তন হচ্ছে। জার্মানির চলমান জ্বালানি রূপান্তরণ (Energy Transition) পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালের হিসাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আসে যথাক্রমে ১৪ ও ৩১ শতাংশ। ২০৩০ সালে তা হবে যথাক্রমে ৩০ ও ৫০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে যথাক্রমে ৬০ ও ৮০ শতাংশ। জার্মানিতে বায়োমাস, বায়ু ও সোলার পিভি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রধান উৎস। ২০০৮ সালের তুলনায় ২০৫০ সালে সাশ্রয় হবে প্রাথমিক জ্বালানি ৫০ শতাংশ, বিদ্যুৎ ৮০, পরিবহনে ব্যবহৃত জ্বালানি ৪০ এবং ভবন উত্তাপে ব্যবহৃত তাপ ৮০ শতাংশ। গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস পাবে ৯০ শতাংশ। জার্মানি আমদানিনির্ভর: জ্বালানি তেলে ৯৭ শতাংশ, গ্যাসে ৮৯, কয়লায় ২৩ এবং বিদ্যুতে ১৩ শতাংশ। অবশ্য বিদ্যুৎ রফতানি ৬ শতাংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬৪১ বিলিয়ন ইউনিট। প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ ৩০৭ দশমিক ৮ এমটিওই। প্রাথমিক জ্বালানি মিশ্রে কয়লা ২৬ শতাংশ, তেল ৩৩, গ্যাস ২১ ও নিউক্লিয়ার ৮ শতাংশ। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৯৯৯ সালে ২৯ বিলিয়ন ইউনিট। ২০১৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১৬১ বিলিয়ন ইউনিট। পক্ষান্তরে ওই সময় নিউক্লিয়ার ও কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পায় যথাক্রমে ১৮০-৯৭ এবং ২৯১-২৬৫ বিলিয়ন ইউনিট। ওই রূপান্তরণের লক্ষ্য, ফসিল ও নিউক্লিয়ার জ্বালানি নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা এবং জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন দ্বারা প্রাথমিক জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও তাপের চাহিদা হ্রাস করে গ্রিনহাউজ গ্যাস তথা কার্বন নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনা। অর্থাৎ কার্বনমুক্ত অর্থনীতি বিনির্মাণ করা। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানিতে স্বনির্ভর হওয়া এবং বিদ্যুৎ রফতানি বৃদ্ধি করা। দৃশ্যমান অগ্রগতিতে বলা যায়, জ্বালানি রূপান্তরণে জার্মানি সফলতা লাভের পথে। চলমান রূপান্তরণের কারণে জার্মানিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয়হার ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল অবধি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। এ সময়ে বিদ্যুতের মূল্যহার বৃদ্ধি পায় ৩৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের শুরুতে প্রথমবারের মতো আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের মূল্যহার হ্রাস পায়। পরবর্তীতে সে বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত ও অবদমিত। এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে জ্বালানি রূপান্তরণ আগামীতেও অব্যাহত থাকবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ আর বিদ্যুতের মূল্যহার বৃদ্ধি হবে না— এমন পূর্বাভাস রয়েছে। এরই মধ্যে ফিড-ইন-ট্যারিফ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে ভর্তুকি এখন অনাবশ্যক। আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের গড় মূল্যহার ২০১৭ সালে ছিল ২৯ দশমিক ১৬ ইউরো সেন্ট। এর ৫৫ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাক্স, লেভি ও সারচার্জ। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ। উৎপাদন ব্যয় ১৯ দশমিক ৩ (৫.০৭ টাকা: ১ ইউরো = ৯০ টাকা)। বাংলাদেশে সে উৎপাদন ব্যয় ৫ দশমিক ২৯ টাকা। অর্থাৎ ২২ পয়সা বেশি। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সে বিদ্যুৎ বাজারে আনতে বিদ্যুৎ সঞ্চালনক্ষমতা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে। সে বিনিয়োগ ব্যয় বিদ্যুতের মূল্যহারে সমন্বয় হওয়ায় গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। ফলে ২০১৩ সালে ইউরোপের যেকোনো দেশ (পোল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক ও ফ্রান্স) অপেক্ষা জার্মানিতে বিদ্যুতের মূল্যহার সর্বাধিক হয়। পরবর্তীতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুত্প্রবাহ বৃদ্ধিতে নবনির্মিত বিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সনাতনী বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। আবার ওই অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যয়হারও হ্রাস পাচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয়হার হ্রাস মূল্যহারে সমন্বয় হওয়ায় গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যহার হ্রাস পাচ্ছে। সেই সঙ্গে জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন অব্যাহত থাকায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ চাহিদা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে। সেবা ও পণ্যের উৎপাদন ব্যয়হার  কমছে। ফলে ভোক্তা বা জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে এবং জীবনমান উন্নয়ন হচ্ছে। বাংলাদেশ এমন সুযোগ হারাচ্ছে। তাই জ্বালানি উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ ও ভাবনা বাড়ছে। ২০১৪ সালের এক সমীক্ষার সূত্রে বলা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ জোরদারে জার্মানির ৯৪ শতাংশ জনগণের সমর্থন রয়েছে। সেখানকার সরকার মনে করে, কোনো রাজনৈতিক দলের সরকারে আসা অনেকটাই নির্ভর করে কথিত জ্বালানি রূপান্তরণে তার দক্ষতা ও সক্ষমতার ওপর। অর্থাৎ জ্বালানি রূপান্তরণে জার্মানিতে গণতন্ত্রায়ন ও জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়েছে। জ্বালানি রূপান্তরণ নানা কারিগরি কর্মযজ্ঞের সমাহার ও সমন্বয়। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম: (১) বিদ্যুৎ মজুদ (এখনো খুবই ব্যয়বহুল) (২) জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন এবং (৩) ব্যাপকভাবে জাতীয় বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্কগুলো সংযোজন ও একীভূতকরণ (যা নানা অঞ্চলের বিদ্যুৎ পরস্পরের মধ্যে ভাগাভাগির সুবিধা দেয়) অন্যতম। এ কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, বাস্তবায়নে পেশাজীবীরা। তাতে জনগণের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান ও কার্যকর। জার্মান বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি রূপান্তরণের সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা মাত্রা রয়েছে। সে রূপান্তরণে প্রাযুক্তিক, রাজনীতিক ও অর্থনীতিক কাঠামোবলির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ এটি একটি প্রক্রিয়া। প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তনও বলা যায়। পক্ষভুক্ত ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট আইনি সংস্কার এ পরিবর্তনের আওতাভুক্ত। ধারণা করা হচ্ছে, সংস্কারের আওতায় পরিবর্তিত আইন জ্বালানি শিল্পে অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনবে। তবে অর্থনীতি ও ভোক্তার ওপর তার প্রভাব হবে সীমিত। তাই ওই সংস্করণ আরো বেশি অর্থনীতিবান্ধব ও ভোক্তা স্বার্থসম্মত হওয়ার ব্যাপারে সেখানকার সরকার মনোযোগী। জ্বালানি রূপান্তরণের ধারণা ১৯৮০ সালে জার্মানির কোনো এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথম প্রকাশ পায়। তাতে নিউক্লিয়ার ও পেট্রোলিয়াম জ্বালানি সম্পূর্ণ বর্জনের আহ্বান জানানো হয় এবং দাবি করা হয়, জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি না করেও আর্থিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব। সে ধারণার পরিধি পরবর্তীতে সম্প্রসারণ হয় এবং আজকের অবয়বে পরিণত হয় ২০০২ সালে। জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয় ২০১৬ সালে। তাতে বলা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় সম্পূর্ণ কার্বনমুক্ত জ্বালানি সরবরাহ হবে। অবশেষে প্রায় সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক হবে এবং তাতে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের হিস্যা অনেক বেশি হবে। তৎসত্ত্বেও রূপান্তরণকালে স্বল্প কার্বনসমৃদ্ধ গ্যাস-বিদ্যুৎ প্লান্টগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান অত্যাধুনিক কয়লাবিদ্যুৎ প্লান্টগুলোও অন্তর্বর্তীকালীন প্রযুক্তি হিসেবে আবশ্যক। ওই রূপান্তরণের লক্ষ্য অর্জনে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে: (১) সব খাতে কার্বন মূল্য আরোপ করা (২) পরিবহন অদল-বদলের মাধ্যমে জ্বালানি চাহিদা হ্রাস করা (৩) নবায়নযোগ্য জ্বালানি অথবা বায়ো-এনার্জি উৎস থেকে নিট বিদ্যুৎ আহরণ করা (৪) জনগণের আহার-উত্তাপন-যাতায়াত অভ্যাস পরিবর্তন করা (৫) শিল্প খাতে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাসে ‘সিসিএস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা (৬) নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধির তাগিদে বাজার উন্নয়ন ও উদ্ভাবন করা এবং (৭) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। ধারণা করা হচ্ছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে এবং নরওয়ে ও সুইডেনের পানি-বিদ্যুৎ জার্মানি ব্যবহার করতে পারবে। নিউক্লিয়ার জ্বালানি বর্জনের সময়সীমা বৃদ্ধি অথবা কয়লাবিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ করার আর দরকার হবে না। জ্বালানি সাশ্রয় ও জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যয় হ্রাস বিদ্যুতের মূল্যহার কমিয়ে আনবে। সর্বোপরি ২০৫০ সাল নাগাদ জ্বালানি রূপান্তরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। জার্মান অর্থনীতি কার্বনমুক্ত হবে। ভোজ্যতেল ও প্রাণিজ চর্বিমুক্ত আহারে জনগণ আরো বেশি বেশি অভ্যস্ত হবে। জাতীয়ভাবে জার্মানরা আরো অনেক বেশি কায়িক পরিশ্রমী ও সব দিক দিয়ে মিতব্যয়ী হবে। পরিশেষে কার্বন তথা দূষণমুক্ত পরিবেশ এবং দুর্নীতি তথা দূষণমুক্ত সমাজ জার্মান জাতিকে মহিমান্বিত করবে। অবশেষে জার্মানির এ জ্বালানি রূপান্তরণ অন্যান্য দেশের জন্য মডেল হবে। এসব আজ আর জার্মান জাতির স্বপ্ন বা ভাবনা নয়, দৃশ্যমান বাস্তব। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির জগতে উন্নয়নের নামে বাংলাদেশে যা কিছু ঘটেছে, তাও এক ধরনের জ্বালানি রূপান্তরণ। সে রূপান্তরণ পরিবেশ ও সমাজ উভয়কেই দূষণমুক্ত নয়, বিরামহীনভাবে দূষণযুক্ত করে চলেছে। এমন রূপান্তরণ কোনো জাতির কাম্য হতে পারে না। বাঙালি জাতিরও নয়। জার্মানির জ্বালানি রূপান্তরণ জার্মানির উন্নয়ন দর্শন হিসেবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। জাতির জন্য কার্বনমুক্ত অর্থনীতি নির্মাণের মাধ্যমে দূষণমুক্ত পরিবেশ ও সমাজ তৈরি করা এ দর্শনের নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি ভূমি। উপরে বর্ণিত পর্যালোচনায় বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরণের যে স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে, তাতে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরণ তথা উন্নয়ন দর্শন জনস্বার্থ ও জনকল্যাণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতির জন্য উচ্চতর আর্থিক প্রবৃদ্ধি বজায় রেখে দূষণমুক্ত পরিবেশ ও সমাজ নির্মাণ করা এ দর্শনের ভিত্তি ভূমি নয়। উন্নয়নের এমন দর্শন দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার ক্ষেত্রে সহায়ক, নাকি প্রতিবন্ধক—এ প্রশ্ন এখন সর্বসাধারণের উদ্বেগ ও ভাবনার বিষয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, আর্থিক প্রবৃদ্ধিতে অদক্ষ শ্রমশক্তি ও তৈরি পোশাক রফতানি আয় মুখ্য। সে আয় বৃদ্ধিতে বিদ্যুৎ প্রবাহ প্রবৃদ্ধির ভূমিকা গৌণ। আবার বিদ্যুৎ প্রবাহ প্রবৃদ্ধি কমাতে আর্থিক প্রবৃদ্ধি অকার্যকর। বাংলাদেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি বিশ্বের দুই ধারার কোনো ধারার প্রবৃদ্ধিরই অনুরূপ নয়। অর্থাৎ এ প্রবৃদ্ধির কোনো তাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। তাই বাংলাদেশে বর্তমান আর্থিক প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই, তাও ভাবনার বিষয়।      আঠারো শতকে কয়লার ব্যবহার ইউরোপে শিল্প বিপ্লব ঘটায়। সে বিপ্লব দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। উনিশ শতকে তেল আমেরিকায় সমৃদ্ধি আনে। পুঁজির বিকাশ ও প্রভাব অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়, যার পরিণতিতে বিশ্বব্যাপী ভূরাজনীতিতে আমেরিকার প্রভাবও বৃদ্ধি পায়। একতা, সমতা ও সংহতি ঝুঁকিতে পড়ে। বিশ শতকে বিশ্বের কোনো কোনো দেশ নিউক্লিয়ার শক্তিতে সমৃদ্ধ হওয়ায় তারা পরাশক্তিতে পরিণত হয়। ফলে ভূরাজনীতিতে সংকট আরো বৃদ্ধি পায়। একুশ শতকে বিশ্বের অর্থনীতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বিকশিত হচ্ছে এবং ফসিল জ্বালানির বিকল্প হিসেবে বাজার দখল করছে। ফলে কার্বনমুক্ত অর্থনীতি বিনির্মাণ বিপ্লব শিল্প বিপ্লবের মতোই ইউরোপে শুরু হয়েছে। সে বিপ্লব দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী এ বিপ্লব জরুরি। তাতে শুধু পরিবেশই নয়, সমাজও দূষণমুক্ত তথা দুর্নীতিমুক্ত হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নে জ্বালানি উন্নয়ন তথা সংস্কার কৌশল দেশকে অতিমাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত করে চলেছে। কার্বণ দূষণে জলবায়ু পরিবর্তনের মতোই সে দুর্নীতিতে সমাজ পরিবর্তন হচ্ছে। এ পরিবর্তন মোকাবেলা করা এখন বাংলাদেশের জন্য অতীব জরুরি। সেজন্য ‘জ্বালানি উন্নয়ন দর্শন’বদলাতে হবে। ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডিন ও অধ্যাপক।  
ক্যাটাগরি: মতামত
‘নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র’
নভেম্বর ৩০, ২০১৭ বৃহস্পতিবার ০৯:৩৬ পিএম - প্রকৌশলী মো. আলী জুলকারনাইন
রিঅ্যাক্টর বলতে কী বোঝায়, তা দিয়েই শুরু করা যাক। রিঅ্যাক্টর হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র, যেখানে নিয়ন্ত্রিতভাবে কোনো রিঅ্যাকশন বা বিক্রিয়া সংঘটিত হয়। বিভিন্ন ল্যাবরেটরি এবং কল-কারখানায় নানা ধরনের রিঅ্যাক্টর ব্যবহৃত হয়। এদের মধ্যে কতগুলো বায়ো-রিঅ্যাক্টর, কতগুলো কেমিক্যাল রিঅ্যাক্টর আবার কতগুলো নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর। নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরে রিঅ্যাকশন বিভিন্ন ধরনের; যেমন- ফিউশন ফিশন ইত্যাদি। ফিউশন বিক্রিয়া সংঘটিত হয় পরমাণুর নিউক্লিয়াসে। আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র, সূর্যে প্রতিনিয়ত ফিউশন বিক্রিয়া ঘটছে। এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্যের মধ্যে হিলিয়াম থেকে শুরু করে লোহা পর্যন্ত অনেক মৌলিক পদার্থ তৈরি হচ্ছে, একই সঙ্গে শক্তি উৎপন্ন হয়। ফিউশন বিক্রিয়ায় ঠিক উল্টোটা ঘটে। এ বিক্রিয়ায় একটি অত্যন্ত ভারী মৌল; যেমন- ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসকে একটি থারমাল নিউট্রন দ্বারা আঘাত করে তা ভেঙে দুই বা তার অধিক হালকা মৌলের নিউক্লিয়াস পাওয়া যায়। সাভারে একটি ফিশন রিঅ্যাক্টর রয়েছে, যা প্রায় ৩০ বছর ধরে চালু আছে। এখানে তাপ উৎপাদন ক্ষমতা তিন মেগাওয়াট। এই রিঅ্যাক্টর কোনো বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে না। এটি আসলে গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হয়। রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ফিশন রিঅ্যাক্টর বসবে। এদের প্রতিটির থারমাল পাওয়ার (তাপশক্তি) হবে প্রায় তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। একটি পরমাণু বিদ্যুৎ ইউনিট যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে তার পরিমাণ সাধারণত ওই ইউনিটের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের থারমাল পাওয়ারের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ হয়ে থাকে। এ হিসাবে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ইউনিট থেকে প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এসব রিঅ্যাক্টরে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়। খনি থেকে প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম মূলত দুই ধরনের ইউ-২৩৮ এবং ইউ-২৩৫ থাকে। আমাদের আলোচিত ফিশন রিঅ্যাক্টরের মূল জ্বালানি ইউ-২৩৫। থারমাল নিউট্রনের মাধ্যমে সংঘটিত ফিশন বিক্রিয়াকে থারমাল ফিশন বলে। এ বিক্রিয়ায় ইউ-২৩৫ নিউক্লিয়াস ভেঙে দুটি ফিশন প্রডাক্ট এবং তিনটি নিউট্রন হয়। এই নিউট্রনগুলো অতি উচ্চশক্তির, যাদের ফাস্ট নিউট্রন বলে। ফাস্ট নিউট্রন ফিশন বিক্রিয়া ঘটাতে পারে না। ফিশনের জন্য প্রয়োজন হয় থারমাল নিউট্রনের, যার শক্তি কম। মডারেটরের মাধ্যমে শক্তি শুষে নিয়ে ফাস্ট নিউট্রনকে থারমাল নিউট্রনে পরিণত করা হয়। সাভারের রিঅ্যাক্টরে এবং রূপপুরে মডারেটর হিসেবে পানি ব্যবহার করা হবে। ফিশন বিক্রিয়ার ফলে কিছু ভর হারিয়ে যায়। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সূত্র অনুসারে হারিয়ে যাওয়া ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ফিশন বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই শক্তির পরিমাণ ২০ কোটি ইলেকট্রন ভোল্ট-ইভি। ১ গ্রাম ইউ-২৩৫-এর সব কয়টি নিউক্লিয়াস ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে ভেঙে ফেলা হলে প্রায় ২৪ মেগাওয়াট ঘণ্টা শক্তি পাওয়া যায়। এ পরিমাণ শক্তি পেতে হলে প্রায় দুই হাজার ৬০০ কেজি কয়লা পোড়াতে হবে। সচল এমনকি বদ্ধ অবস্থায় একটি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরে বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ জমা হয়। এগুলো থেকে বিচ্ছুরিত রেডিয়েশন (বিকিরণ) থেকে আশপাশের জনগণ এবং সম্পদকে রক্ষার জন্য রিঅ্যাক্টরের চারপাশ ঘিরে বিভিন্ন পদার্থের পুরু বিকিরণ নিরোধ আস্তরণ স্থাপন করা হয়। রিঅ্যাক্টরে চলমান ফিশন বিক্রিয়া যে তাপ উৎপন্ন হয়, তা অপসারণ না করা হলে জ্বালানি দণ্ড, কন্ট্রোল রড এবং রিঅ্যাক্টরের অন্যান্য কাঠামো গলে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে রিঅ্যাক্টরে উৎপন্ন তাপ সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়। এ ব্যবস্থাটি কুলিং সিস্টেম বা শীতক ব্যবস্থা নামে পরিচিত। রাশিয়ার পাওয়ার রিঅ্যাক্টরগুলোকে ভিভিইআর বলা হয়। রুশ ভাষায় পানিকে ভোদো বলা হয়। ভিভিইআরের প্রথম ভি দ্বারা বোঝায় এই রিঅ্যাক্টরের শীতক বা পানি। দ্বিতীয় ভি দ্বারা বোঝায় রিঅ্যাক্টরে মডারেটর হিসেবেও পানি ব্যবহৃত হয়। শেষের ইআরের অর্থ এনার্জি রিঅ্যাক্টর। অর্থাৎ ভিভিইআরের অর্থ দাঁড়াল ওয়াটার কোল্ড, ওয়াটার মডারেটেড এনার্জি রিঅ্যাক্টর। রূপপুর প্ল্যান্টের প্রতিটি রিঅ্যাক্টরকে ঘিরে পরপর দুটি ‘কনটেইনমেন্ট’ বিল্ডিং থাকবে। ভেতরেরটা প্রাইমারি কনটেইনমেন্ট এবং বাইরেরটি সেকেন্ডারি কনটেইনমেন্ট। কংক্রিটের তৈরি প্রাইমারি কনটেইনমেন্টের দেয়াল হবে ১.২ মিটার পুরু এবং এই দেয়ালের ভেতরের তলদেশ ঢাকা থাকবে ছয় মিলিমিটার পুরু লোহার আস্তরণ দিয়ে। প্রাইমারি কনটেইনমেন্ট থেকে ১.৮ মিটার দূরে থাকবে ০.৫ মিটার পুরু কংক্রিটের সেকেন্ডারি কনটেইনমেন্ট। প্রায় ১০০ মিটার বা সেন্টিমিটার বেগে ধাবমান ৫.৭ টন ওজনের একটি বিমান আছড়ে পড়লেও এই কনটেইনমেন্টের কোনো ক্ষতি হবে না। কনটেইনমেন্টের কাজ হচ্ছে কোনো কারণে যদি রিঅ্যাক্টরের প্রাইমারি কুলিং সিস্টেম থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নির্গত হতে থাকে; তবে তাকে বাইরে বেরোতে না দিয়ে নিজের মধ্যে আটকে রাখা। মূল রিঅ্যাক্টর হলো, একটি লোহার পাত্র যার উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার, ব্যাস ৫ মিটার, দেয়ালের পুরুত্ব ২০ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৪০০ টন। এখানে ইউরেনিয়াম জ্বালানি, কন্ট্রোল রড এবং মডারেটর, শীতক থাকে। ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরির জন্য যে রিঅ্যাক্টর ব্যবহৃত হয়, তার ভেতরে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৮৬ হাজার টন পানি প্রবাহিত করতে হয়। রিঅ্যাক্টর কোর থেকে বেরোনোর সময় পানির তাপমাত্রা থাকে প্রায় ২৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই পানিকে তিনটি শীতকের ভেতর দিয়ে নিয়ে প্রায় সাধারণ তাপমাত্রায় নদী অথবা সমুদ্রে ছাড়া হয়। রিঅ্যাক্টর কোরে উৎপাদিত কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ যদি কোনোভাবে প্রাইমারি কুলিং লুপের পানিতে মেশে, তবুও তা কখনও সেকেন্ডারি এবং কনডেন্সার (তৃতীয়) কুলিং লুপের বাধা অতিক্রম করে নদী অথবা সমুদ্রে পৌঁছে না। নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে এর তাপ উৎপাদন ক্ষমতা বন্ধ হয় না। এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এমন একটি রিঅ্যাক্টর বন্ধ করার পর মুহূর্তে কোরে ২১০ মেগাওয়াট তাপ উৎপন্ন হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই তাপে উৎপাদনের হার কমতে থাকে। মাসখানেক পর এর পরিমাণ এসে দাঁড়ায় প্রায় ৪.৫ মেগাওয়াটে। ফিশন রিঅ্যাকশন বন্ধ হওয়ার পরও এই তাপ উৎপাদনের কারণ হলো রিঅ্যাক্টর চলার সময় এর কোরে বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ উৎপন্ন হয়। উৎপাদিত তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো হতে বহু বছর ধরে অতি উচ্চশক্তির গামা, বিটাসহ বিভিন্ন ধরনের রশ্মি বিকিরিত হতে থাকে। বিকিরিত এই রশ্মিগুলো রিঅ্যাক্টরে কোরের বিভিন্ন পদার্থে শোষিত হয়ে তাপ উৎপন্ন করে। এভাবে উৎপাদিত তাপ ‘ডিকে হিট’ নামে পরিচিত। রিঅ্যাক্টর কোর থেকে ডিকে হিট সরানো না হলে কোরের তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে এক সময় জ্বালানি দণ্ডগুলো গলে গিয়ে বিপর্যয় ঘটতে পারে। ১৯৮৬ সালে আমেরিকার থ্রি-মাইল আইল্যান্ড এবং ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমার রিঅ্যাক্টরগুলোতে সংঘটিত দুর্ঘটনার মূল কারণ ছিল যথাসময়ে ডিকে হিট অপসারণ করতে না পারা। ১৯৫৪ সালে প্রথম জেনারেশন (জেন-১) রিঅ্যাক্টর দিয়ে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে তৃতীয় জেনারেশন (জেন-থ্রি), এমনকি জেন-থ্রি প্লাস রিঅ্যাক্টর নির্মাণ করা হচ্ছে। বর্তমানে ৩০টি দেশে প্রায় ৪৪৭টি রিঅ্যাক্টর ইউনিট চালু রয়েছে, যা থেকে বিশ্বের উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের প্রায় ১১ শতাংশ উৎপাদিত হচ্ছে। রূপপুরে যে রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে তা জেন-থ্রি প্লাস ঘরানার। জেন-থ্র্রি প্লাস রিঅ্যাক্টরের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো অত্যন্ত নিরাপদ। যে কোনো পরিস্থিতি, এমনকি থ্রি-মাইল আইল্যান্ড কিংবা ফুকুশিমার মতো সংকটজনক পরিস্থিতিতেও এ রিঅ্যাক্টরগুলোর কোর গলে গিয়ে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়বে না। প্যাসিভ নিরাপত্তা নামে এক ধরনের বিশেষ ব্যবস্থার কারণে এগুলো এমন নিরাপদ হয়েছে। প্যাসিভ নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিক শক্তি যেমন মাধ্যাকর্ষণ, সংকুচিত স্প্রিং বা গ্যাসের চাপ, ন্যাচারাল কনভেকশন কুলিং ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে এসব রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নির্মিত হয়। ফলে কোনো কারণে বিদ্যুৎ না থাকলেও প্যাসিভ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিকে হিট অপসারণ করে রিঅ্যাক্টর কোরকে শীতল রাখা সম্ভব হয়। অর্থাৎ জেন-থ্রি প্লাস রিঅ্যাক্টরের সব বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা যদি কোনো দূর্ঘটনার ফলে বন্ধ হয়ে যায় (ফুকুশিমা বিদ্যুৎকেন্দ্রে (জেন-টু প্রযুক্তির) যেমনটি হয়েছিল), সে ক্ষেত্রে এই প্যাসিভ নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো কোনো অপারেটরের সাহায্য ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে ডিকে হিট অপসারণ করবে। এর ফলে রিঅ্যাক্টর কোর তথা তেজস্ক্রিয় জ্বালানির কোনো ক্ষতি হবে না। এখানে যে সময়ের (২৪ ঘণ্টার) কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাকে বলা হয় গ্রেস পিরিয়ড। ফুকুশিমা রিঅ্যাক্টরের ক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ডের মান ছিল মাত্র ৩০ মিনিট। রূপপুরের রিঅ্যাক্টরগুলোর প্রতিটিতে ৭টি অ্যাকটিভ (অর্থাৎ বিদ্যুৎ দ্বারা চালিত) এবং ৮টি প্যাসিভসহ মোট ১৫টি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেলের নিচে থাকবে প্রায় ৮০০ টন ওজনের একটি কোর ক্যাচার। কোনো কারণে রিঅ্যাক্টরের কোর গলে গেলে ওই গলিত কোর ধারণ করে তা শীতল করবে এই কোর ক্যাচারটি। এর ফলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ কোনো অবস্থাতেই রিঅ্যাক্টর বিল্ডিংয়ের মেঝে ভেদ করে বাইরে আসতে পারবে না। অর্থাৎ এই রিঅ্যাক্টর হতে কখনোই পরিবেশের বা এর আশপাশে বসবাসকারী লোকজনের কোনো ক্ষতি হবে না। ফিশন বিক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম জ্বালানি থেকে যেসব তেজস্ক্রিয় ফিশন পদার্থ উৎপন্ন হয় তা থেকে পরিবেশকে রক্ষার জন্য রূপপুরের রিঅ্যাক্টরে পাঁচ স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথম নিরাপত্তা বেষ্টনী হচ্ছে ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সসাইড। এর পরের বেষ্টনী হচ্ছে জ্বালানির চারপাশ ঘিরে থাকা জিরকোনিয়াম ধাতু দ্বারা তৈরি আবরণ বা ক্ল্যাডিং। তৃতীয় স্তরে রয়েছে প্রাইমারি কুলিং সিস্টেমের প্রেসার বাউন্ডারি। চতুর্থ এবং পঞ্চম নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় ‘কনটেইনমেন্ট’ বিল্ডিং। এই রিঅ্যাক্টর বিল্ডিংয়ের চারপাশে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত এলাকায় লোকজনকে বসবাস করতে দেওয়া হয় না। এ এলাকাটি ‘এক্সক্লুসন’ জোন নামে পরিচিত। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে এক্সক্লুসন জোনের পরিমাণ ৮০০ মিটার। এক্সক্লুসন জোনের পরের জায়গাজমি দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজে ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুৎ ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত বিশ্বের একটি রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে সে সময় প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে আমাদের ৬৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া না গেলে গ্যাসের মজুদ আগামী ১৫-১৬ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। দেশের কয়লা বিভিন্ন কারণে উত্তোলন করা যাচ্ছে না। তেল ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বেশি। সৌরবিদ্যুৎ ব্যয়বহুল ও অনেক জমি প্রয়োজন। কাজেই সব দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশকে পরমাণু বিদ্যুতের দিকে যেতে হচ্ছে। পরমাণু বিদ্যুতের সুবিধাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, এখানে গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপাদিত হয় না, জ্বালানি খরচ তথা উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম কম, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে দীর্ঘ সময় অর্থাৎ প্রায় ৭০-৮০ বছর ধরে চলে ইত্যাদি। এছাড়া পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন বিষয়ে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীনের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এই দুটি দেশই ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের বর্তমান পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় দশগুণ বাড়িয়ে যথাক্রমে ৬০ হাজার এবং দুই লাখ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বহুসংখ্যক পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের আশপাশে চালু হবে। এর মানে না চাইলেও সে সময় আমাদের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের প্রভাবের মধ্যেই বসবাস করতে হবে। ফলে নিজের দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে তা থেকে উপকৃত হওয়াটাই যথাযথ বলে প্রতীয়মান হয়। প্রকৌশলী মো. আলী জুলকারনাইন, সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। সূত্র: সমকাল
ক্যাটাগরি: মতামত
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা ও ইউনেস্কোর আপত্তি প্রত্যাহার
জুলাই ১৬, ২০১৭ রবিবার ১২:০৩ পিএম - সালেক সুফি
গত ৬ জুলাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়েছে জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান বিষয়ে তাদের বিতর্কিত আপত্তি প্রত্যাহার করেছে।  কয়লা ভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহৃত হবে আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি এবং এর সঙ্গে খুবই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে স্বল্প মাত্রায় কার্বন নিঃসরণের জন্য। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সুন্দরবনের মূল অংশ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে রামপাল। পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি সুন্দরবনের প্রান্তসীমায় রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে তাদের আগের আপত্তি তুলে নিয়েছে। সেই সঙ্গে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোর তালিকায় যুক্ত করার পদক্ষেপ থেকেও ইউনেস্কো সরে এসেছে। গত সপ্তাহের বুধবার পোল্যান্ডে চলমান ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪১তম অধিবেশনে সুন্দরবনের পাশে নির্মাণাধীন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে শুনানির পর ওই ঘোষণা আসে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় কোন কোন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন থাকবে, কোনটি বাদ যাবে এবং কোন নিদর্শন ঝুঁকিতে রয়েছে - সেসব বিষয়ে ২১ সদস্যের এই হেরিটেজ কমিটিই সিদ্ধান্ত নেয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহি চৌধুরির নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইউনেস্কোর ওই অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং রামপাল বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।’ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রকল্প। বিপিডিবি বাংলাদেশ এবং এনটিপিসি  ইন্ডিয়া এই দুই কোম্পানীর ৫০ শতাংশ করে সমান মালিকানা থাকবে বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী কয়লা বিদ্যুৎ কোম্পানীতে। বাংলাদেশ সরকার বাগেরহাটের রামপালে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জায়গা নির্ধারণ করেছে যেটা সুন্দরবনের পেরিফেরি বা মূল অংশ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে। বাংলাদেশের পরিবেশ আইনে ১০ কিলোমিটার এলকার মধ্যে এমন কোন স্থাপনা বসানো নিষেধ রয়েছে। রামপালের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐহিত্যের যে  অংশ সুন্দরবনের মধ্যে অবস্থিত তা থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।  রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য যে জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পতিত, অনুর্বর এবং মূলত চিংড়ি চাষের জন্য ব্যবহৃত হতো। খুব অল্প পরিমাণে জমির মালিক ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যে পরিমাণ মানুষকে পুর্নবাসন করতে হবে তার পরিমাণও খুব কম। প্রকল্পটি পশুর নদীর তীরে অবস্থিত হওয়াতে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা।  কৃষি জমির ক্ষতি না করে, অধিক মানুষের পুর্নবাসন করা লাগছে না তদুপরি নদীর ধারে প্রকল্পটির অবস্থান হওয়াতে প্রকৌশল দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা সবচেয়ে উত্তম জায়গাতেই এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ হচ্ছে। রামপালকে আর একটা কারণে নির্বাচন করা হয়েছে যে, পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ শেষ হলে এবং মংলা পোর্টকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে বিশেষ রপ্তানী প্রক্রিয়া অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে যাতে করে বিপুল পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নকশার সময় থেকেই উচ্চ তাপ নিয়ন্ত্রণকে মাথায় রাখা হয়েছে। স্বল্প মাত্রার সালফার এবং কয়লার ছাই ব্যবহার করা হবে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে।  যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে তাতে কয়লা থেকে ৯৮ শতাংশ সালফার শোষণ করবে। একইভাবে, ইলেকট্রনিক প্রিসিপাইটরি পারদ এবং কয়লার ছাইকে সরিয়ে ফেলবে। পানির তাপমাত্রা কমানোর জন্য অত্যাধুনিক কুলিং টাওয়ারের মাধ্যমে কোল্ড ওয়াটার রিসাইকেল সিস্টেম ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ একই পানি ঠান্ডা করে পুনরায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গরম পানি কোনভাবেই পশুর নদীতে ফেলা হবে না। রামপাল থেকে পশুর নদীতে যে পরিমাণ পানি যাবে তার পরিমাণ শূন্য দশমিক শূন্য ৫ ভাগ। রামপালে যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে তার জন্য কার্বন নি:সরণ কম হবে এবং পরিবেশের উপর কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়া বের করার জন্য ২৭৫ মিটার উঁচু চিমনি থাকবে  যাতে করে পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর কোন প্রভাব না পড়ে। রামপাল থেকে সুন্দরবনের দিকে বাতাসও কম থাকে, বছরের সর্বোচ্চ ৯০-১০০ দিনের মত বাতাস সেই দিকে প্রবাহিত হয়। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অস্ট্রেলিয়া অথবা ইন্দোনেশিয়া থেকে খুবই উন্নতমানের কয়লা আমদানি করা হবে। প্যানামেক্স জাহাজে করে (যার প্রতিটির ধারণ ক্ষমতা ৮০ হাজার থেকে ১লাখ ২০ টন ) কয়লা পরিবহন করা হবে। জাহাজগুলো বিশেষভাবে ঢাকা থাকবে যাতে করে কয়লার ছাই বাইরে না আসে। সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদী দিয়ে মাত্র এ রকম দুইটি জাহাজে করে কয়লা নেয়া হবে রামপালে। যদিও প্রতিদিন কমপক্ষে ২০০ জাহাজ চলে সেই জলপথ দিয়ে। তার পরেও শব্দহীন এই দুটি জাহাজ হয়তো কোন বড় কোন ইস্যু না। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র তিন মাসের কয়লা সংরক্ষণ করে রাখতে পারবে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশেই ২ শতাধিক অভিজ্ঞ  প্রকৌশলী থাকবেন সব সময়। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা যদি কোন আপত্তি না করেন তবে কেন এই বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ নন তারা বার বার আপত্তি তুলছেন তা বোধগম্য নয়। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবন থেকে যথেষ্ট নিরাপদ দূরত্বেই অবস্থান করছে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো যে দেশের গণমাধ্যমে জ্বালানী বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাদেরকেই বিবেচনা করা হয় যাদের এই বিষয়ে নূন্যতম কোন ধারণাই নেই। রামপাল নিয়ে শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ এবং জ্বালানী বিশেষজ্ঞ নয় এমন ব্যক্তিদের আপত্তির জবাবে অনেকবার বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তাদের আপত্তির সঠিক সদুত্তর দেয়া হয়েছে। রামপাল বিরোধীরা আন্তর্জাতিক কয়লা বিদ্যুৎ বিরোধী এনজিও’র অর্থায়নে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে। ইউনেস্কোও তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিল। ২০১৬ সালের প্রথম দিকে ইউনেস্কো থেকে একটি পর্যবেক্ষক দল আসে যারা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সুন্দরবনের জন্য তাদের উদ্বেগ জানিয়েছিল। দু:খজনক হলেও সত্যি যে ওই পর্যবেক্ষক দলের প্রতিবেদন প্রকাশ না হলেও বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষার জাতীয় কমিটি নিজেদের মত করে সুন্দরবন ইস্যুতে তাদের নিজস্ব ভাষ্য প্রচার করতে শুরু করে সরকারের কোন কথা না শুনেই। ইউনেস্কোর পর্যবেক্ষণও এখন পাওয়া গেল। গত ৪ জুলাই পোল্যান্ডের ক্র্যাকোভ শহরে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সুন্দরবন ও প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য কি ধরণের সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় কোন কোন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন থাকবে, কোনটি বাদ যাবে এবং কোন নিদর্শন ঝুঁকিতে রয়েছে- সেসব বিষয়ে ২১ সদস্যের এই হেরিটেজ কমিটিই সিদ্ধান্ত নেয়। দীর্ঘ বিতর্কের পর ইউনেস্কোর হেরিটেজ কমিটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে।  সুন্দরবনের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ  প্রোপার্টি সংরক্ষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের স্বাগত জানিয়েছে ওই কমিটি। হেরিটেজ কমিটির অনুরোধে বাংলাদেশ সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের একটি কৌশলগত পরিবেশগত মূল্যায়ন (এসইএ) গ্রহণের জন্য সম্মত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির অধিবেশন এখনো শেষ হয়নি। বৈঠকের শেষে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কমিটির সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত ১৯ মে ২০১৭ তারিখে সভার কার্যবিবরণীর উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু গণমাধ্যমে এখনও মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফ্রান্সের প্যারিসে গত ১৯ মে’র আলোচনার সিদ্ধান্ত কোন মতেই ৪ জুলাইয়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হতে পারে না। মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার কোন কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না। ভারতের এক্সিম ব্যাংক ঋণ ছাড়ের পর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ খুব সুন্দরভাবে এগিয়ে চলেছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আগামী ৪৮ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করবে এবং ২০১৯ সালের কোন এক সময়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। যারা মনে করে কয়লাভিত্তিক জ্বালানীর দিন শেষ তাদের উদ্দেশ্য বলছি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সরকার কর্তৃক বিশেষজ্ঞ কমিটির এক গবেষণা পরিচালিত হয়েছে যে আধুনিক কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নবায়নযোগ্য শক্তি যেমন- সৌর শক্তি বা বায়ু শক্তির থেকেও কম খরচে উৎপাদন করা যায়। অস্ট্রেলিয়া সরকার পুরাতন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি সংস্কারের মাধ্যমে নতুন ধরনের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকে যাচ্ছে। সামনের দিনেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিই প্রধান ভরসা হয়ে থাকবে। আমরা সর্বদা আস্থাশীল যে, ইউনেস্কো বা কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থা সরকারি প্রতিনিধির কাছ থেকে সমস্ত তথ্য ও নথিপত্র পেলে তারাও রামপাল নিয়ে তাদের অবস্থান পরিস্কার করতে পারবে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে, সরজমিনে পরিদর্শন  করে যা জানা গেছে পরিকল্পিত নকশা এবং অবকাঠামোর কারণে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। আমরা আশাকরি তাত্ত্বিক ও আন্দোলনকারীরা অগ্রাধিকারভিত্তিক জাতীয় এই প্রকল্প সম্পর্কে আর বিতর্ক তৈরি থেকে বিরত থাকবেন। একই সময়ে আমরা আশা করবো বিশেষজ্ঞদের দ্বারা তৈরী একটি কমিটি দিয়ে সরকার সবসময় পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি তদারকি করবে। এই প্রকল্পে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি ভারতীয় বিশেষজ্ঞদেরকেও দরকার হবে। যদিও এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করে আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের তেমন কোন দক্ষতা নেই। লেখক: সাবেক পরিচালক (পরিচালন), জিটিসিএল এবং আফগানিস্তানের খনিজ ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক
ক্যাটাগরি: মতামত
‘ভোক্তাস্বার্থে এলপিজি’র দাম ৭০০ থেকে কমিয়ে ৪৫০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা উচিত’
নভেম্বর ১৩, ২০১৬ রবিবার ১২:৪৬ পিএম - ড. এম শামসুল আলম
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন ২০০৩-এর ধারা ২(খ) ও (ল) এবং ধারা ২৭ (২) অনুযায়ী বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিইআরসির লাইসেন্সি। লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাসসহ (এলপিজি) সব পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দাম নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণের একক এখতিয়ার ওই আইনের ধারা ২২(খ) ও ২২(ড) এবং সাধারণভাবে ওই আইনের অধ্যায় ৬ ও অধ্যায় ৭-এর আওতায় বিইআরসি’র। দুই. ২০০৯ সালের ১ মার্চ বিপিসি ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজি ও ফার্নেস অয়েলের দাম কমানোর প্রস্তাব সংবলিত একটি আবেদন বিইআরসি’র কাছে পেশ করে। ১৩ মার্চ বিইআরসি ২০০৯/২ নং আদেশে প্রতি ১২ দশমিক ৫ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার এবং প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ভোক্তাপর্যায়ে যথাক্রমে ১ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৮৫০ এবং ৩০ টাকা থেকে নামিয়ে ২৬ টাকা পুনর্নির্ধারণ করে। গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ আদেশ ১৫ মার্চ রাত ১২টার পর থেকে কার্যকর করা হয়। ২০০৯ সালের ১০ জুন বিপিসি পুনরায় বিইআরসি’র কাছে এলপিজি’র দাম কমানোর আবেদন করায় ১৭ জুন বিইআরসি ২০০৯/৬ নং আদেশে প্রতি ১২ দশমিক ৫ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৮৫০ থেকে কমিয়ে ৭০০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করে। এ আদেশে বিইআরসি’র পূর্ব-অনুমোদন ব্যতিরেকে এলপিজি অথবা অন্য কোনো পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি না করার ব্যাপারে বিপিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপর আর বিপিসি এলপিজি অথবা অন্য কোনো পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দাম পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে বিইআরসিতে আসেনি। অবশ্য পরবর্তীতে বিপিসির প্রস্তাবে জ্বালানি বিভাগ নির্বাহী আদেশে ডিজেল, পেট্রল ও ফার্নেস অয়েলের মতো পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দাম হ্রাস-বৃদ্ধি করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আইন লঙ্ঘন হয়েছে। তবে এলপিজির দাম আর হ্রাস-বৃদ্ধি হয়নি। অদ্যাবধি সিলিন্ডারপ্রতি এলপিজির দাম ৭০০ টাকা বহাল রয়েছে। তবে বাজারে এ দামে এলপিজি পাওয়া যায় না। এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বেচাকেনা হয়। বাজার ব্যক্তিখাত এলপিজি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। তিন. দাম কমানোর ওই দুই আদেশেই বলা হয়েছে, দেশে বিপণনকৃত এলপিজির মার্কেটে বিপিসির শেয়ার ১৬-২০ শতাংশ। বাকি সিংহভাগই ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠান বাজারজাত করে। বিপিসির এলপিজির উৎস ইস্টার্ন রিফাইনারি ও কৈলাসটিলা গ্যাসফিল্ড। ব্যক্তিখাত নানা সুবিধা নিয়ে এলপিজি বিপণন করায় বিপিসি প্রতিযোগিতায় বাজার হারাচ্ছে। তাছাড়া কৈলাসটিলায় এলপিজির ধারণক্ষমতা সীমিত হওয়ায় তা পুড়িয়ে ফেলতে হচ্ছে। ফলে একদিকে মূল্যবান জাতীয় সম্পদ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। তাই দাম কমানো হলে বিপিসির বিপণনকৃত এলপিজির বিক্রি বাড়বে এবং জাতীয় সম্পদের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই আইনের ধারা ৩৪(৪) মতে, বিচারিক শুনানি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই বিইআরসি ওই দুই আদেশে এলপিজির দাম পুনর্নির্ধারণ করে। তবে উভয় আদেশেই বলা হয়েছে, বিইআরসি পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে বিপিসির পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দাম নির্ধারণের বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিচারিক শুনানি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবে। অথচ আজ পর্যন্ত সে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। আদেশে আরো বলা হয়েছিল, বিপিসির বাজারজাত প্রতিটি এলপিজি সিলিন্ডারের গায়ে গ্যাসের পরিমাণ ও সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য অমোচনীয় কালিতে লিখিত থাকতে হবে। এ নির্দেশ আদেশ জারির তিন মাসের মধ্যে কার্যকর করতে হবে। এ আদেশও প্রতিপালিত হয়নি। যদিও বিইআরসির আইন ও আদেশ অমান্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চার. পরবর্তীতে সার এবং গ্রিড ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন, শিল্প, বাণিজ্য, আবাসিক তথা সব শ্রেণীর গ্রাহকদের গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবরাহ বৃদ্ধি না হওয়ায় গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকে। প্রতি বছরই সেচ মৌসুমে সার উৎপাদন বন্ধ রেখে বিদুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে সেচে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। শিল্পে গ্যাস সংকট মোকাবেলায় সার উৎপাদন বন্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন আবাসিক, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহনে সরকার প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার অনুৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করেছে। তাই, এলপিজি বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। শুরুতে এ জ্বালানি চাহিদা ও ব্যবহার সীমিত ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজিসহ অন্যান্য জ্বালানির দরপতন এবং আমাদের বাজারে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মোকাবেলায় গ্যাস সংকটের তীব্রতা এলপিজিকে এখন বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।  পাঁচ. এলপিজি ব্যবহার জনপ্রিয় হলে গ্যাসের ওপর চাপ কমবে এবং জ্বালানি সংকট নিরসন হবে। তাই আবাসিক, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ, কলকারখানা ও পরিবহনে গ্যাস ও ডিজেলের পাশাপাশি বা পরিবর্তে সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি ব্যবহারে যেন মানুষ আগ্রহী হয়, সে বিবেচনায় বিপিসির এলপিজির দাম কমানোর প্রস্তাব বিইআরসি’র কাছে পেশ করা জরুরি ছিল। কিন্তু বিপিসির কাছ থেকে সে প্রস্তাব আসেনি। পরিশেষে গত ৩১ জুলাই ভোক্তাদের পক্ষ থেকে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭০০ থেকে কমিয়ে ৪৫০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করার প্রস্তাব সংবলিত এক আবেদন বিইআরসি’র কাছে পেশ করে। সে প্রস্তাবে যেসব তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপিত হয়েছে, তা নিম্নে পেশ করা হলো— ছয়. বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতে সিলিন্ডারপ্রতি এলপিজি’র নির্ধারিত মূল্য ও তার বিভাজনের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা— বাংলাদেশে সিলিন্ডারপ্রতি ১২ দশমিক ৫ কেজি কর-পরবর্তী পরিশোধিত এলপিজির নির্ধারিত মূল্য ৫৩৩ টাকা, তার ওপর বাজারজাতকরণ ভ্যাট সিলিন্ডারপ্রতি ২৮ টাকা। সিলিন্ডারজাতকরণ মার্জিন ৬০ টাকা, এর পর আবারো আরোপিত ভ্যাট ৯ টাকা। বিতরণ কোম্পানি মার্জিন ১৬ টাকা, পরিবহন ব্যয়সমতা মার্জিন ৩২ টাকা, ডিলার কমিশন ১০ টাকা এবং সিস্টেম লস ১২ টাকা। অতএব, ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশে ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজির সিলিন্ডারপ্রতি নির্ধারিত মূল্য ৭০০ টাকা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বাজারে প্রতি সিলিন্ডারে এলপিজি পাওয়া যায় ১২ কেজি। ভারতে ১৪ দশমিক ২ কেজি। ফলে ভারতের এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্যহারকে বাংলাদেশের সমতুল্য মূল্যহারে পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে এলপিজির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১২ কেজি। সাত. ভারতে এলপিজি ভ্যাট মুক্ত। অর্থাৎ ভারত এলপিজি খাতকে রাজস্বের উৎস হিসেবে গণ্য করে না। বাংলাদেশী মুদ্রায় ভারতে ১২ কেজি এলপিজি’র সমতুল্য মূল্য, সিলিন্ডারজাতকরণ মার্জিন, বিতরণ কোম্পানি মার্জিন,পরিবহন ব্যয়সমতা মার্জিন, ডিলার কমিশন ও সিস্টেম লস যথাক্রমে ৩৪৮ দশমিক শূন্য ৮ টাকা, ৪০ দশমিক ৮৩, ৯ দশমিক ৯২, ৩১ দশমিক ১৫, ১০ দশমিক শূন্য ৫ এবং ৪৩ দশমিক ৪৭ টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশী মুদ্রায় ভারতের বাজারে বিপণনকৃত প্রতি সিলিন্ডার এলপিজির মূল্য ৪৮৩ দশমিক ৫০ টাকা। এ মূল্য নির্ধারণে ১২ কেজি এলপিজির এক্স-রিফাইনারি মূল্য ধরা হয়েছে। অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব ১২ কেজি ধরা হলে সিলিন্ডারপ্রতি এলপিজির মূল্য ৪৮৩ দশমিক ৫০ টাকার চেয়ে কম হতো। আট. আলোচ্য প্রেক্ষাপটে এলপিজির মূলহার যৌক্তিকীকরণের লক্ষ্যে প্রস্তাবমতে মূল্যহারের বিভিন্ন উপাংশ পুনর্নির্ধারণ করে সিলিন্ডারপ্রতি মূল্যহার ৭০০ টাকার স্থলে ৪৫০ টাকা নির্ধারণ করার জন্য ক্যাবের ওই আবেদন। আবেদনে বলা হয়েছে, যেহেতু এলপিজির নির্ধারিত মূল্যে ভারত দরপতন সমন্বয় করে কর-পরবর্তী পরিশোধিত এলপিজির মূল্যহার যৌক্তিক করেছে, সেহেতু সে মূল্যই বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩৪৮ টাকা প্রস্তাবিত মূল্যহারে প্রস্তাব করা হয়েছে। ভারতে সিলিন্ডারজাতকরণ মার্জিন ৪০ দশমিক ৮৩ টাকা যৌক্তিক প্রতীয়মান হওয়ায় প্রস্তাবে সে মার্জিন ৪০ টাকাই প্রস্তাব করা হয়েছে। বিতরণ কোম্পানির বিদ্যমান মার্জিন অত্যধিক বিবেচিত হওয়ায় তা ২৫ শতাংশ হ্রাস করে ১২ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। ভারতে সে মার্জিন ৯ দশমিক ৯২ টাকা। জনঘনত্ব বেশি ও গড় দূরত্ব তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় ভারতের তুলনায় আমাদের অভ্যন্তরীণ এলপিজির গড় পরিবহন ব্যয় অনেক কম হবে। সেই বিবেচনায় ভাড়াসমতা ব্যয়হার বিদ্যমান ব্যয়হার অপেক্ষা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে ২৮ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যান্য ব্যয়হার অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে এসব ব্যয়হার গণশুনানির মাধ্যমে যাচাই-বাছাইসাপেক্ষ।  নয়. ক্যাব আবেদনে বলেছে, ‘এলপিজি’র বাজার এখন অসাধু ব্যবসাকবলিত। এ বাজার রাষ্ট্র বা বাজার কেউই নিয়ন্ত্রণ করে না, নিয়ন্ত্রিত হয় ব্যবসায়ীদের দ্বারা। ভোক্তাস্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষার্থে এলপিজির দাম ৭০০ থেকে কমিয়ে ৪৫০ টাকা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সে প্রস্তাবমতে, ‘এলপিজির দাম পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে বাজার বিইআরসির নিয়ন্ত্রণাধীন এনে এলপিজিকে অসাধু ব্যবসামুক্ত করা ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় জরুরি।’ দশ. গত ১৮ আগস্ট বিইআরসি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি শেষ করে। সে শুনানিতে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব অযৌক্তিক ও সামঞ্জস্যহীন বলে প্রমাণিত হয়। তা সত্ত্বেও এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের ওই আবেদন আমলে নেয়নি। আবার গণশুনানিতে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব যৌক্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও তা বিবেচনায় না নিয়ে বিইআরসি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। কোরাম সংকটের কারণে মূল্যবৃদ্ধির আদেশ প্রদানে বিলম্ব হচ্ছে। এরই মধ্যে ১১টি ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিকে এলপিজি আমদানির লাইসেন্স দেয়া হয়েছে/হচ্ছে। ৮০০ ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু আমদানি ব্যয় হ্রাস পেলেও এলপিজির দাম কমেনি। বরং ভর্তুকি দেয়ার কথা চলছে। এগারো. আমদানি ব্যয় হ্রাস সমন্বয় করে এলপিজির মূল্য পুনর্নির্ধারণ ছাড়াই ব্যক্তিখাতকে এলপিজি আমদানির সুযোগ দেয়া হচ্ছে এবং সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ টাকা ভর্তুকির কথাও বলা হচ্ছে। এভাবে এলপিজিকে প্রতিযোগিতাহীন বাজারের হাতে ছেড়ে দিয়ে জনগণকে জিম্মি করা রাষ্ট্রের আদর্শের পরিপন্থী। ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডিন ও অধ্যাপক।   
ক্যাটাগরি: মতামত
প্রসঙ্গঃ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র-পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর প্রভাব
নভেম্বর ০১, ২০১৬ মঙ্গলবার ১১:০৯ এএম - প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন
বিদ্যুৎ ছাড়া সভ্যতার অগ্রযাত্রা অকল্পনীয়। যেকোন দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অপরিহার্য। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের ধারাকে অব্যাহত রেখে সরকার রূপকল্প ২০২১-এর মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশের মর্যাদায় উন্নীত করতে বদ্ধপরিকর। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যতীত এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (ইনস্টল্‌ড ক্যাপাসিটি) ১২,৭৮০ মেগাওয়াট। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৭৬% বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে। মাথাপিছু বিদ্যুতের ব্যবহার ৪০৭ কিঃওঃঘঃ (ক্যাপটিভসহ)। বিদ্যুৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমানকে ২৪,০০০ মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালে মধ্যে ৬০,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে হবে। বর্তমানে গ্যাস দ্বারা ৬২.৩৮% বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই হার বজায় থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই গ্যাসের মজুদ অনেক কমে যাবে। বিদ্যুৎ খাতে, শিল্প খাতে, পরিবহন খাতে, বাণিজ্যিক খাতে, আবাসিক রান্নার কাজে-সর্বত্রই গ্যাস প্রয়োজন। গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বহুমুখী অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানী (সৌর, বায়ু ইত্যাদি) ব্যবহারপূর্বক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫০ ভাগ অর্থাৎ ২০,০০০ মেগাওয়াট অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কয়লা ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন করতে হবে। সরকার সীমিত প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে কম খরচে কয়লার দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে যে কয়েকটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে তার মধ্যে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র অন্যতম, যা “মৈত্রী সুপার থারমাল পাওয়ার প্রজেক্ট” নামে পরিচিত। উল্লেখ্য, সাউথ আফ্রিকায় মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৯৩%, চীনে ৭৮.৯%, অস্ট্রেলিয়ায় ৭৮%, ভারতে ৬৮%, আমেরিকায় ৪৯.১%, জাপানে ২৬.৮%, পাকিস্তানে ৬%, বাংলাদেশে ২.৫% এবং সমগ্র পৃথিবীতে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪১% কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়। এতে দেখা যায়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বাংলাদেশের অবস্থান সারা পৃথিবীর মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে মূল শহরে পর্যন্ত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির (আল্ট্রা-সুপার ক্রিটিকাল টেকনোলজি) এবং উন্নত ব্যবস্থাপনার ফলে পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব মুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে। এমনকি আমাদের দেশে বড়পুকুরিয়ায় অবস্থিত পুরাতন প্রযুক্তির (সাব-ক্রিটিকাল টেকনোলজি) বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এ পর্যন্ত এর কোন ক্ষতিকর প্রভাব পরিবেশে পড়েনি। স্থান নির্বাচনঃ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিতব্য প্রতিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থান নির্বাচনের পূর্বে ২-৩ বছর ব্যাপী Feasibility Study, Environmental Impact Assessment(EIA), Social Impact Assessment (SIA)-সহ ১০-১২টি সমীক্ষা সম্পন্ন করে প্রকল্পের স্থান নির্বাচন করা হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের গাইড লাইন অনুযায়ী অভিজ্ঞ কর্মকর্তাগণ কর্তৃক বিভিন্ন অপশনের পর আর্থিক, কারিগরি ও সামাজিক দিক দিয়ে সম্ভাব্য যুক্তিযুক্ত হওয়ায় বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার রাজনগর ইউনিয়নের সাপমারি কাটাখালী ও কৈগড়দাসকাটি মৌজায় স্থানটি নির্ধারণ করা হয়। সমীক্ষাঃ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে প্রাথমিক পরিবেশগত পরীক্ষা (IEE) ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রি-কন্সট্রাকশন এবং কন্সট্রাকশন সময়কালে পরিবেশগত পরিমিতি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ সমীক্ষা, কয়লা পরিবহনের জন্য অপর একটি পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) সমীক্ষা চলমান আছে। তাছাড়াও গত প্রায় তিন বছর যাবৎ ত্রৈমাসিক ভিত্তিক EMP মনিটরিং কাজ চলমান রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণঃ এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। সাধারণতঃ প্রতি মে.ও. বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ০.৫ হতে ০.৭ একর জায়গার প্রয়োজন হয়। ১,৩২০ মে.ও. করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এজন্য মোট ৯১৫.৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। অধিগ্রহণকৃত জায়গা নদীর তীরবর্তী হওয়ায়, নদীর তীর হতে প্রায় ৩০/৪০ মিটার দূর হতে বাঁধ নির্মাণ করা হবে। ১,৩২০ মে.ও. বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বহির্ভাগে প্রায় ১০০ একর জমিতে সবুজ বেষ্টনী বা বনায়ন করা হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চতুর্পাশে সবুজ বেষ্টনীতে প্রায় ২,০০,০০০ (দুইলক্ষ) গাছ রোপণ করা হবে। প্রকল্প তথ্যাদিঃ ১। প্রকল্প খরচঃ      ২.০০৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার (৭০% লোন, ৩০% ইক্যুয়িটি) ২। ইক্যুয়িটি শেয়ারঃ ৫০ : ৫০ (বিউবো : এনটিপিসি)। ৩। কার্যসম্পাদনঃ ২০১৯। ৪। ভূমি অধিগ্রহণঃ ১৮৩৪ একর। তার মধ্যে ৯১৫.৫ একর বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানী লিমিটেড বরাবরে প্রদান। ৫। উৎপাদন ক্ষমতাঃ ১,৩২০ মেঃওঃ (২x৬৬০মেঃওঃ)। ৬। প্রযুক্তিবিদ্যাঃ সুপারক্রিটিক্যাল। ৭। জ্বালানিঃ আমদানীকৃত কয়লা সালফার (সর্বোচ্চ ০.৯%), জিসিভি (কিলোক্যালরি / কেজি) : ৫,৪০০-৬,০০০। ৮। কয়লার প্রয়োজনঃ           দৈনিক ১০,০০০ মেট্রিক টন। ৯। সম্ভাব্য কয়লার উৎসের দেশঃ       ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিন আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং মোজাম্বিক। ১০। কয়লা পরিবহনঃ উৎস দেশ হতে প্রতি সপ্তাহে ৮০,০০০ টন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি মাদার ভেসেলে কয়লা বাংলাদেশের আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত আসবে। আকরাম পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ১০,০০০-১২,০০০ টন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি বার্জ আকরাম পয়েন্ট থেকে প্রকল্পের স্থান পর্যন্ত আসবে। ১১। চিমনির উচ্চতা-পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মানুসারেঃ ২৭৫ মিটার বা ৯০২ ফিট বা ৯০ তলা বিল্ডিং এর বেশী উচ্চতায়। ১২। পানি শীতলিকরণ পদ্ধতিঃ ক্লোজড সাইকেল  (কোন গরম পানি বের হবে না)।   বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাবঃ   পরিবেশবান্ধব ১,৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থারমাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান সুন্দরবনের প্রান্ত সীমা থেকে ১৪ কি.মি. দূরে এবং ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট থেকে ৬৫ কি.মি. দূরে অবস্থিত। অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের গবেষণা ও মতামতের ভিত্তিতে বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের সকল নিয়মকানুন ও শর্ত মেনেই প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ চলছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিবেশ বান্ধব। যেকোনো স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগে কয়েকটি বিষয় চিন্তা করতে হয়। যেমন সেই স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে কী পরিমাণ মানুষকে স্থানান্তরিত করতে হবে, স্থানান্তরিত হবার ক্ষতিপূরণ কী পরিমাণ, এলাকাটি কৃষি জমি কিনা, সেখানকার পরিবহন ব্যবস্থা, পরিবেশ, আর্থ-সামাজিক প্রভাব, এলাকার উন্নয়ন ইত্যাদি বিবেচনা করতে হয়। বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থানে স্থানান্তরিত মানুষের সংখ্যা খুবই কম। কারণ সেখানে জমি অনুর্বর এবং কৃষির উপযোগী নয়। জায়গাটির অধিকাংশই সরকারি খাসজমি। ১,৩২০ মে.ও.  এর এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা পরিবহন, প্রয়োজনীয় পানির উৎস ইত্যাদি বিবেচনা করে এই জায়গাটি নির্বাচন করা হয়েছে।   বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে অত্যাধুনিক সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এই প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বল্প কয়লায় বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। ফ্লু-গ্যাস ডি-সালফারাইজেশন (এফজিডি) এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে নির্গত গ্যাসে SOx নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং বিশেষতঃ সালফার ডাই অক্সাইড (SO2) প্রায় সম্পূর্ণ শোষিত হবে। একইভাবে নাইট্রোজেন এর অক্সাইড (NOx) নির্গমন নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য আধুনিক বার্নার ডিজাইন করা হবে। এ কারণে নির্গত SOx বা NOx এর পরিমাণ নিরাপদ মাত্রার অনেক নীচে থাকবে।   বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে আমদানীকৃত কয়লা ব্যবহার করা হবে তা লো-এ্যাশ কন্টেন্ট এবং লো-সালফারযুক্ত। ফলে অল্প কয়লা ব্যবহারে আরো কম ছাই ও কম সালফার তৈরী হবে যা নিয়ন্ত্রণ করা বেশি সহজ হবে। উৎপাদিত ছাই Electro Static Precipitator (ESP) এর Hopper এ সংগৃহীত হবে এবং ১০০% ছাইসিমেন্ট, ইট তৈরী প্রভৃতি কাজে ব্যবহার করা হবে। ফলে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ছাই বাতাসে নির্গত হয়ে পরিবেশ দূষিত হবে না।   আবৃত অবস্থায় কয়লা পরিবহন, মজুদ এবং প্ল্যান্টে ব্যবহার করা হবে। ফলে বাতাসে উড়ে বা পরিবহনের সময় পানিতে মিশ্রিত হয়ে দূষণের কোনো সম্ভাবনা নেই। কয়লা পরিবহণের জাহাজ চলাচল নিয়ে ও উদ্বেগের কিছু নেই। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দৈনিক গড়ে একটি মাত্র ছোট জাহাজ দ্বারা (যার বহণ ক্ষমতা ১০-১২ হাজার টন) লাইটারেজ প্রক্রিয়ায় আবৃত অবস্থায় কয়লা আনা হবে। এতে পরিবহণের সময় কয়লা ছড়িয়ে পড়ার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। আর সপ্তাহে গড় একটি মাত্র মাদার ভেসেল আকরাম পয়েন্টে আসবে। এই বিষয়ে Environmental Impact and Social Assessment (EISA) সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে যার ফলাফল ও ইতিবাচক।   বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত চিমনীর উচ্চতা ৯০০ ফুটের অধিক হওয়ায় চিমনী থেকে নির্গত পরিশোধিত বায়ু প্রকৃতি ও পরিবেশের কোনো ক্ষতি করবে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চলমান অবস্থায় কোনো ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হবে না। অতি অল্প পরিমাণ পশুর নদীর (0.05% of the Lean Period) পানি ব্যবহার করা হবে। এতে পানির ব্যবহার ও অপচয় অত্যন্ত কম হবে। তাপমাত্রা কমানোর জন্য অত্যাধুনিক কুলিং টাওয়ারের মাধ্যমে ক্লোজড ওয়াটার রিসাইকেল সিস্টেম ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ একই পানি ঠান্ডা করে পুনরায় ব্যবহার করা হবে। যে সামান্য পানি পশুর নদীতে নির্গত হবে তা পরিশোধিত এবং তাপ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে অপরিশোধিত গরম পানি কোনোভাবেই পশুর নদীতে ফেলা হবে না।   এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন এবং রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বের হওয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশে সবুজবেষ্টণী (Carbon Sink) তৈরী করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সেখানে ২ লক্ষাধিক বৃক্ষরোপণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ৯৫০০ বৃক্ষরোপণ করা হয়ে গেছে। এই বনায়ন এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানী (প্রাঃ) লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) ইতোমধ্যেই বনবিভাগের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এছাড়াও সার্বক্ষণিক পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং তা চলমান থাকবে।   আন্তর্জাতিক মানের চুক্তিঃ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সম্পাদিত চুক্তিটি সম্পূর্ণ সুষম আন্তর্জাতিক চুক্তি। প্রকল্প ব্যয়ের ৭০% ঋণ এবং ৩০% ইকুয়িটি। ৭০% ঋণ ও এর সুদ বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানী লিঃ পরিশোধ করবে। ইকুয়িটি ৩০% এর মধ্যে ১৫% বাংলাদেশ এবং ১৫% ভারত সরকার প্রদান করবে এবং মোট আয়ের অর্ধেক হিসেবে (৫০-৫০) বিউবো ও এনটিপিসি পাবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ এর শতভাগ বাংলাদেশে ব্যবহৃত হবে।   বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে নিঃসরিত গ্যাস ও এর গ্রহণযোগ্য মাত্রাঃ গ্যাস সুন্দরবনের বর্তমান অবস্থা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০০৫ সনের নীতিমালা অনুযায়ী বিশ্বব্যাংকের গ্রহণযোগ্য মাত্রা মন্তব্য NOx মিলিগ্রাম প্রতি ঘনমিটার ( ɲg/nm3)(বছরে) ১৮ ২৩.৯ ১০০ ৪০ নিঃসরিত গ্যাস নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে নিম্নে থাকায় সুন্দরবন বা পরিবেশের কোন ধরনের কোন ক্ষতির আশংকা নাই। SOx মিলিগ্রাম প্রতি ঘনমিটার ( ɲg/nm3) (বছরে) ৯.৫ ১৯.৩৬ ৮০ - Flue Gas Desulphurisation (FGD) স্থাপনে ৯.৫ ০.৯৯ ৮০ -   Electro Static Precipitator (ESP) যন্ত্র ব্যবহার করার মাধ্যমে উড়ন্ত ছাই (Fly Ash) এর ৯৯% ধরে রাখা সম্ভব হবে। Flue Gas Desulphurization (FGD) যন্ত্র ব্যবহার করার মাধ্যমে ৯৬% সালফার ধরে রাখা হবে। ESP FGD যন্ত্র ব্যবহার করার মাধ্যমে ৯০% এর অধিক পরিমাণ পারদ ধরে রাখা যাবে।   অর্থনৈতিক / প্রতিবেশগত প্রভাবঃ মৈত্রী বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। আর্থ-সামাজিক দিক থেকে দেখতে গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হবে, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন হবে, জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বাড়বে, জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে, শিক্ষাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং উন্নত যোগাযোগ সুবিধা তৈরী হবে। এছাড়া, জাতীয় জ্বালানী নিরাপত্তার ভিত্তি আরো সুদৃঢ় হবে, স্বল্প খরচে নির্ভরযোগ্য জ্বালানী সরবরাহ ও শিল্প উন্নয়ন হবে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেচ ব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্য এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ফলে পুরো এলাকাটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি এলাকায় পরিণত হবে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে সুন্দরবনের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বনের উপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং বন কেটে বসতি স্থাপন ও আবাদ, মৎস্য আহরণ এবং নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড হ্রাস পাবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সম্প্রসারণের ফলে সুন্দরবনের উপর স্থানীয় অধিবাসীদের নির্ভরশীলতা কমবে, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য সুন্দরবনের ক্ষতিকর কর্মকান্ডের প্রবণতা হ্রাস পাবে যা সুন্দরবনের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে। কর্পোরেট স্যোশাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) এর অংশ হিসেবে বিআইএফপিসিএলের জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ড স্থানীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। যেমন বিআইএফপিসিএল প্রকল্প এলাকায় প্রায় দুই বছর ধরে স্থানীয় অধিবাসীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং স্থানীয় মহিলা ও যুবকদেরকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার লক্ষ্যে সেলাই ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রকল্প এলাকার জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতি ইউনিটে তিন পয়সা হিসাবে লেভী ধার্য করে উক্ত অর্থ দিয়ে একটি উন্নয়ন তহবিল গঠন করে প্রকল্প এলাকার মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে। এই হিসাবে তহবিলটিতে বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা জমা হবে যা জনকল্যাণ এবং বন সুরক্ষায় ব্যয় করা হবে। উপসংহারঃ পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলো লক্ষ লক্ষ মেঃওঃ (জার্মান, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে) নদী, বন ও খনিমুখের আশেপাশে অবস্থিত থাকে এবং এতে ইকোসিস্টেম, শব্দদূষণ, পরিবেশ দূষন, বর্জ্য নিঃসরন সমস্যা হচ্ছে না। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও একইভাবে শূন্য ডিসচার্জ, সুপারক্রিটিকাল প্রযুক্তি, নিঃসরিত সকল ধরনের গ্যাস পরিবেশ অধিদপ্তরের গ্রহনযোগ্য মাত্রার নীচে রেখে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ও পরিবেশ বান্ধব যন্ত্রপাতি দ্বারা নির্মিত হবে বলে পরিবেশের কোন ক্ষতির আশংকা নাই। প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন: মহাপরিচালক, পাওয়ার সেল, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ।    
ক্যাটাগরি: মতামত
‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের রূপকল্প ২০৪১’
মে ২৮, ২০১৬ শনিবার ০১:৪৯ পিএম - ড. মুশফিকুর রহমান
‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান ২০১০’ এর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে, সুতরাং তার নবায়ন, বাস্তবানুগ পরিবর্তন নিশ্চয়ই করা দরকার। সরকার জাপানের পরামর্শকদের সহায়তায় সে কাজটি করছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, আগামী মাসেই (জুন ২০১৬) ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬’ প্রকাশ করার কথা। ২০১০ সালের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, এ সময়ের অর্জন এবং অবাস্তবায়িত পরিকল্পনার অংশগ্রহণমূলক ও  নিবিড় বিশ্লেষণ করার পর নতুন পরিকল্পনা নিলে তা যৌক্তিক হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো থেকে উত্তরণের কৌশল নিরূপণ করা। ২০০৯ সালে যখন ২০১০ সালের মাস্টারপ্ল্যানটি নিয়ে কাজ চলছিল, তখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণব্যবস্থা যেমন অনির্ভরযোগ্য ও ভঙ্গুর পর্যায়ে ছিল, তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। প্রধানত তেলভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে বিদ্যুৎব্যবস্থার আরও উন্নতি করতে হলে কিছু সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হবে। আরও টেকসই বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা গড়ার প্রয়োজনীয়তা এখন অনুভূত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্য দুই বছর ধরে ‘অস্বাভাবিক’ কম। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্রমেই বেশি পরিমাণে আমদানি করা জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়েও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য সহনীয় সীমার মধ্যেই রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু গত এপ্রিলের রেকর্ডভাঙা গরম ও বৃষ্টিহীন সময়ে সবাই যেন হঠাৎ টের পেতে শুরু করল, আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণব্যবস্থায় গুরুতর কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। লোডশেডিং আবারও নিয়মিত এবং প্রলম্বিত হতে শুরু করেছে। এর আপাতত কারণগুলোর একটি হিসেবে নৌপথে তেল পরিবহন ধর্মঘটের কয়েক দিন গত এপ্রিলের বিঘ্ন উসকে দিয়েছিল। সেই ধর্মঘট কেটে যাওয়ার পরও লোডশেডিং গত বছরের গ্রীষ্মের পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়নি। ইতিমধ্যে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে বলা হলেও কার্যত ৮ হাজার থেকে ৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে। নাজুক বিতরণব্যবস্থায় (৫ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিজের দরকারি অক্সিলারি পাওয়ারে, ৩ শতাংশ সঞ্চালন ও ১০ শতাংশ বিতরণ পর্যায়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ হারিয়ে যাচ্ছে) ব্যাপক চাহিদার সময়ও গ্রাহকের জন্য কার্যত ৬ হাজার ৬৩৫ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহকৃত বিদ্যুতের সঙ্গে অন্তত আরও ২ হাজার মেগাওয়াট বেশি বিদ্যুৎ যুক্ত করা গেলে দেশে আপাতত সন্তোষজনক একটা বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলছে, স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহ আগামী দিনে কমে যাওয়া ছাড়া বাড়ানোর কোনো তথ্য দিচ্ছে না। বরং ২০০০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রায় ৮ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের বিপরীতে মাত্র ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে পেট্রোবাংলা বিদ্যমান গ্যাস মজুত দ্রুত নিঃশেষ করার সংকেতই দিচ্ছে। আগামী দুই বছরে আমদানি করে আনা তরল গ্যাস (এলএনজি) যদি দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় সংযুক্ত করা সম্ভব হয়, তাহলেও জ্বালানি গ্যাসের ব্যাপক চাহিদার সামান্যই পূরণ হবে। সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী ২০২১ সালে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর মহৎ উদ্যোগের জন্য দেশবাসী চেয়ে আছে। সে লক্ষ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব করতে হবে ২০২১ সালে। ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান ২০১০’ এর অন্যতম নির্দেশনা ছিল দেশি ও আমদানি করা কয়লা ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ অংশের উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য প্রাথমিক জ্বালানির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার বাড়ানো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশীয় প্রাথমিক জ্বালানি (গ্যাস ও কয়লা) অনুসন্ধান ও উত্তোলন আশানুরূপ মনোযোগ পায়নি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সাময়িক স্বল্পমূল্য ব্যবস্থাপকদের মধ্যে আত্মপ্রসাদের ভ্রান্তিবিলাস তৈরি করেছে বলে মনে হয়। এখন আমদানি করা তরল জ্বালানি গ্যাস ও কয়লা দিয়ে প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম জোগান নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে নেওয়া যায়নি। আমদানিনির্ভর প্রাথমিক জ্বালানি তরল গ্যাস, তেল ও কয়লা ব্যাপক মাত্রায় ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য কত হবে, তার নির্মোহ বিশ্লেষণও করা হয়নি। সে আলোকে ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬’ এর লক্ষ্য ও করণীয় নির্ধারণ যৌক্তিক। ইতিমধ্যে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬ তে অনুমান করা হয়েছে ২০৪১ সালে বিদ্যুতের মোট চাহিদা হবে ৫২ হাজার মেগাওয়াট, এর বিপরীতে ৫৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার জন্য প্রধানত আমদানি করা প্রাথমিক জ্বালানি ও আমদানি বিদ্যুতের ওপর ভরসা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ কয়লা (১ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদনসহ), ৩৫ শতাংশ গ্যাস (গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমদানি করা তরল গ্যাসসহ), ৫ শতাংশ তরল (আমদানি) জ্বালানি এবং অবশিষ্ট পরমাণু বিদ্যুৎ, আমদানি বিদ্যুৎসহ অন্যান্য উৎস থেকে জোগানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কা ও জিজ্ঞাসা জাগিয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় ২০৪১ সালের জন্য এখন বিদ্যুতের জোগান নিয়ে পরিকল্পনা করার বদলে ২০২১ এর রূপকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে অধিকতর মনোযোগী হওয়াকে অনেকে যৌক্তিক ভাবছেন। কেননা বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনক্ষম করা, ২০২১ এর আগেই আরও প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এসব চ্যালেঞ্জ আছে। সেই সঙ্গে মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ ভোক্তার জন্য সহনীয় মূল্যে সরবরাহ করাও এক বড় চ্যালেঞ্জ। নির্মাণাধীন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অগ্রগতি, জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামোর উন্নয়ন পরিস্থিতির আরও নিবিড় বিশ্লেষণ এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের স্বরূপ অনেকটাই স্পষ্ট করবে। ড. মুশফিকুর রহমান: খনি প্রকৌশলী, জ্বালানি ও পরিবেশ–বিষয়ক লেখক। সূত্র: প্রথম আলো  
ক্যাটাগরি: মতামত
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের আইনবহির্ভূত হস্তক্ষেপ বিপন্ন করছে বিইআরসির স্বাধীনতা
মে ১১, ২০১৬ বুধবার ১০:১২ পিএম - ড. এম শামসুল আলম
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ মতে তিনিই ভোক্তা, যিনি বিধি দ্বারা নির্ধারিত মূল্যে পণ্য ক্রয় বা সেবা গ্রহণ করেন বা করতে সক্ষম। যিনি তা পারেন না, তিনি ভোক্তা হিসেবে স্বীকৃত নন। ওই পণ্য বা সেবা লাভের অধিকারী নন। এ আইনে জ্বালানি ও বিদ্যুতের লভ্যতায় সেবা। সুতরাং এ আইনে পণ্য হোক আর সেবাই হোক, তা মূল্যের বিনিময়ে লাভ করলে বা করতে সক্ষম হলে তার ওপর ভোক্তার স্বত্বাধিকার অর্জিত হয়। সে স্বত্বাধিকার সংরক্ষণে বিধি দ্বারা জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যহার নির্ধারণ একটি মৌলিক বিষয়। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ  খাত উন্নয়ন নীতি, কৌশল ও পরিকল্পনা ভোক্তা তথা গণবান্ধব না হলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয়হার বৃদ্ধির প্রবণতা বাড়ায় মূল্যহার বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে। ফলে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় অনিশ্চয়তা নেমে আসে। বর্তমানে এমন অনিশ্চয়তা দৃশ্যমান। এ প্রেক্ষাপটে এ লেখা। দুই. সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদ মতে, ভূমি ও সাগরের অন্তঃস্থ সব জ্বালানি সম্পদের মালিক প্রজাতন্ত্র এবং ৭ অনুচ্ছেদ মতে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। ১৩ অনুচ্ছেদ মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালির মালিক জনগণ। ফলে জনগণের মালিকানায় রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি খাতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ  উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালির সৃষ্টি হয় এবং ১৫ অনুচ্ছেদ মতে, রাষ্ট্র জনগণের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ চাহিদা মেটায়। ১৯ অনুচ্ছেদ মতে, তা বণ্টন  ও বিতরণে রাষ্ট্রকে সমতা নিশ্চিত করতে হয়। ২১ অনুচ্ছেদ মতে, জাতীয় সম্পদ হিসেবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ  রক্ষা করা জনগণের দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই দেশের যেকোনো নাগরিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সম্পদ রক্ষার জন্য আন্দোলন করতে পারেন। এমনকি ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করতে পারেন। তাছাড়া ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন রক্ষার নিশ্চয়তা থাকায় জ্বালানি নিরাপত্তার অভাবে জনজীবন যদি বিপন্ন/হুমকির সম্মুখীন হয়, তাহলেও তার প্রতিকারের জন্য রিট আবেদন করা যায়। তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরী কমিশনের (বিইআরসি) দায়িত্ব যথাযথভাবে প্রতিপালন করলে ভোক্তাদের আন্দোলন কিংবা রিট আবেদন কোনোটিই করার দরকার হয় না। তাই ভোক্তাদের জন্য বিইআরসি এবং তার দক্ষতা ও সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তিন. পণ্য বা সেবা পাওয়া দেশের যেকোনো মানুষের মৌলিক অধিকার, তা মূল্যের বিনিময়ে লাভ করার সামর্থ্য তার থাক বা না থাক, তিনি তা পাবেন। রাষ্ট্রের গৃহীত নীতি বা কৌশল সে প্রাপ্তি নিশ্চিত করে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে যেসব উপকরণ বা সামগ্রী পণ্য বা সেবা হিসেবে ভোক্তা পাবেন, জ্বালানি ও  বিদ্যুৎ তাদের অন্যতম। ফলে সংবিধান সূত্রে জ্বালানি ও বিদ্যুতে জনগণের থাকা স্বত্বাধিকার এ আইনে সংরক্ষিত নয়। অর্থাৎ ভোক্তাবহির্ভূত জনগণের জ্বালানি অধিকার সংরক্ষণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন ২০০৩ সীমাবদ্ধ। ফলে বাণিজ্যিক বিবেচনায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, আমদানি, সঞ্চালন, বিতরণ ও বণ্টনে গৃহীত নীতি ও কৌশল এবং বিধি ও বিধান সংবিধান সূত্রে অর্জিত জ্বালানি ও বিদ্যুতে জনগণের স্বত্বাধিকার সংরক্ষণে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং ক্ষেত্র বিশেষে সাংঘর্ষিক। তাই এ আইনে জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণে বিইআরসিকে বিশেষভাবে সজাগ ও সতর্ক থাকা দরকার। চার. বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন ২০০৩ মতে, বিইআরসি এনার্জি সেক্টরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান। ওই আইনে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্যাস সম্পদ ও পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের সঞ্চালন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, ওই খাতে ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, মূল্যহার নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনায়ন, ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বিইআরসি প্রতিষ্ঠিত। ওই আইনের ২২ ধারার বিধানাবলিতে কমিশনকে প্রদত্ত ক্ষমতাবলির মধ্যে এ প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্য: ১. এনার্জি অডিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয় নিশ্চিত, ২. লাইসেন্সির সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে স্কিম অনুমোদন করা, ৩. গুণগত মান নিশ্চিতে কোডস অব স্ট্যান্ডার্ডস প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা, ৪. এনার্জি পরিসংখ্যান সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পর্যালোচনা ও প্রচার করা, ৫. সমতা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং ৬. ভোক্তা বিরোধ, অসাধু ব্যবসা বা সীমাবদ্ধ (মনোপলি) ব্যবসা-সম্পর্কিত বিরোধের উপযুক্ত প্রতিকার নিশ্চিত করা এবং আইনের ৩৪ ধারার বিধানাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ১. মূল্যহার নির্ধারণ-সংক্রান্ত নীতিমালা ও পদ্ধতি প্রণয়ন ও তা অনুসরণ করা ২. তাতে ভোক্তা স্বার্থ বিবেচনা করা এবং ৩. দক্ষতা, ন্যূনতম ব্যয়, উত্তম সেবা প্রদান ও উত্তম বিনিয়োগ বিবেচনা করা। তাছাড়া বিইআরসি আইন ও বিইআরসির আদেশ লঙ্ঘন এ আইনের ৪২ ও ৪৩ ধারা মতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সে অপরাধের দায়ে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। এসব ক্ষমতাবলে বিইআরসি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অসাধু ব্যবসা মুক্ত রাখতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি করতে পারে। স্বল্পতম ব্যয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। গ্রাহকভেদে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বণ্টন ও মূল্যহার নির্ধারণে সমতা নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি প্রান্তিক গ্রাহক শ্রেণীকে মূল্যহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে পারে। এসব সম্ভব হলে ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে বিইআরসি সফল হবে। পাঁচ. জীবন ধারণের জন্য মানুষের খাদ্য, পানি, বায়ু ও বাসস্থান যেমন অপরিহার্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেমনই অপরিহার্য। তাই তা প্রাপ্তি তার এখন মৌলিক অধিকার। দারিদ্র্য বিমোচন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য যা করণীয়, তার জন্য সামর্থ্য বা সক্ষমতা থাকা চাই। সে সক্ষমতা নির্ভর করে অপরিহার্য পণ্য খাদ্য ও বাসস্থান এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবার ওপর জনগণের কতখানি স্বত্বাধিকার আছে, তার ওপর। যদি  সে স্বত্বাধিকার প্রকৃতই থেকে থাকে, তাহলে মাথাপিছু বাণিজ্যিক জ্বালানি/বিদ্যুৎ প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং সে প্রবাহ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। ফলে দারিদ্র্য নিরসন অব্যাহত থাকে এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক সাড়া পড়ে। বাংলাদেশ এখন সে অবস্থার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তবে সংস্কারের নামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ব্যক্তিখাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য গৃহীত নীতি ও কৌশলের ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যহার দ্রুত ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধির সামঞ্জস্যতা রক্ষা করতে না পারায় সংকট নিরসন হচ্ছে না। তাতে অচিরেই জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর সাধারণ ভোক্তা তথা জনগণের স্বত্বাধিকার টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। ফলে জ্বালানি/বিদ্যুৎ প্রবাহ প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে এবং নিম্ন আয়ের ফাঁদে আটকে পড়া মানুষের মুক্তি ও জীবনমান উন্নয়ন অনিশ্চয়তার শিকার হবে। তাই এ বিষয় মূল্যহার নির্ধারণে বিইআরসির বিশেষভাবে বিবেচনা করা দরকার। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হতে হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ৭ শতাংশের অধিক হারে অর্জন করতে হবে। সেজন্য জ্বালানি প্রবাহ প্রবৃদ্ধি এমন হতে হবে, যাতে বিদ্যুৎ প্রবাহ প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ হারে অব্যাহত থাকে। সে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জ্বালানি প্রবাহ প্রবৃদ্ধি একদিকে যেমন নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে তেমন স্বল্প মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জ্বালানি মিশ্রণে গুণগত ও পরিমাণগত পরিবর্তন আনতে হবে। উল্লিখিত ওসব কারণে যথাযথভাবে সেসব পরিবর্তন আসেনি। প্রবৃদ্ধি বজায় রাখাও সম্ভব হয়নি। ছয়. ২০০৮ সালে খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি সহনীয় পর্যায়ে থাকেনি। খাদ্যসংকট মোকাবেলায় বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানি করতে হয়। ফলে চালের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। তখন বাজারে খাদ্যঘাটতি না থাকলেও ক্রয়ক্ষমতা না থাকার কারণে জনগণ অন্নকষ্টের শিকার হয়। ফলে যেকোনো সময়ের তুলনায় তখন খাদ্যনিরাপত্তা ছিল অধিকতর বিপর্যস্ত। আদিকালে কৃষক নিজের শ্রমে খাদ্য উৎপাদন করে খাদ্যের মালিক হতেন। বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন কেবল ভূমি ও শ্রমনির্ভরই নয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নির্ভরও। ২০০১ সালে কৃষিতে বাণিজ্যিক জ্বালানি ব্যবহার হয় ১১০ বিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য জ্বালানি। অর্থাৎ সে বছরে ব্যবহূত মোট বাণিজ্যিক জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ। বর্তমানে তার পরিমাণ আড়াই গুণ ছাড়িয়ে গেছে। কৃষি এখন শিল্পের মতোই জ্বালানি এবং প্রযুক্তিঘন। চাষে তরল জ্বালানি, সেচে বিদ্যুৎ, সারে গ্যাস এবং কীটনাশকেও জ্বালানি লাগে। তাই কৃষিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কতটা সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা যায়, তার ওপর নির্ভর করে খাদ্যের ওপর কত সহজে ভোক্তার স্বত্বাধিকার অর্জিত হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর স্বত্বাধিকার অর্জনে জনগণ সক্ষম না হলে জ্বালানি নিরাপত্তা বিপর্যয়ে পড়ে। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা বিপন্ন হয়। তাই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর জনগণের স্বত্বাধিকার নিশ্চিত হতে হবে। সুতরাং জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিপর্যয়ের মধ্যে রেখে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ সত্য অনুধাবন করা জরুরি। সাত. মানুষ অন্নকষ্টের শিকার হবে কিনা, তা যেমন খাদ্যঘাটতি না থাকার ওপরই শুধু নির্ভর করে না, নির্ভর করে যেমন তার উৎপাদন ব্যয় কিংবা বাজারমূল্যের ওপর, তেমন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতি না থাকলেও যদি তার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, কিংবা বাজারমূল্যে তা কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলেও তার ওপর স্বত্বাধিকার অর্জিত না হওয়ায় খাদ্যের মতোই মানুষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কষ্টের শিকার হয়। তাই আমাদের মতো নিম্নবিত্তের মানুষের দেশে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে এবং সেসঙ্গে ভর্তুকির সহায়তায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাজারমূল্য খাদ্যের অনুরূপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, যাতে তার ওপর মানুষের স্বত্বাধিকার নিশ্চিত হয়। শুধু ভর্তুকিতে সে মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে না, স্বল্পতম ব্যয়ে উৎপাদন নিশ্চিত করার কৌশল গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু মূল্যহার নির্ধারণে ভর্তুকিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে, সরবরাহ ব্যয় কমিয়ে আনার কৌশল গ্রহণের প্রতি নজর দেয়া হয়নি। বরং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রেখে ভর্তুকি কমানোর কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ ও বিপণন ব্যয় কমিয়ে এনে আর্থিক ঘাটতি হ্রাস করে ভর্তুকি কমানোর কৌশল গ্রহণ গুরুত্ব পায়নি। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বণ্টন এবং মূল্যহার নির্ধারণে সমতা নিশ্চিত করার কোনো কৌশল গ্রহণ না করায় ভোক্তারা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। মূল্যহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের অভিঘাত থেকে প্রান্তিক ভোক্তা শ্রেণীর সুরক্ষায় গৃহীত কৌশল নামমাত্র, ফলপ্রসূ নয়। কেবল  জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যহার বৃদ্ধি করে ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের কৌশল গ্রহণ করার কারণে ভোক্তাদের স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষণে বিইআরসি সফল হয়নি। আট. বিইআরসি আইনে এনার্জির সংজ্ঞায় এনার্জি হিসেবে গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অন্তর্ভুক্ত হলেও কয়লা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন এবং ব্যক্তিখাত বিদ্যুৎ উৎপাদন বিইআরসির আওতাভুক্ত নয়। বাংলাদেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বাজার উন্মুক্ত অর্থাৎ ডিরেগুলেটেড নয়, রেগুলেটেড। আপস্ট্রিমে রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ এবং ডাউনস্ট্রিমে বিইআরসি। আইন ও প্রবিধান অনুসারে বিইআরসি সে রেগুলেটরির দায়িত্ব পালন করে, সরকার পালন করে অ্যাডহকভিত্তিতে ইচ্ছাধীনে। এমন ভয়াবহ অসঙ্গতি ভাবা যায় না।  নয়. জ্বালানি তেল ও সিএনজির ফিড গ্যাসের মূল্যহার নির্ধারণের একক এখতিয়ার বিইআরসির। কিন্তু বিইআরসি সে মূল্যহার নির্ধারণ করে না। সরকারি খাতের গ্যাস ক্রয় মূল্যহার নির্ধারণ প্রক্রিয়ার মতোই এ মূল্যহার নির্ধারণ প্রক্রিয়ারও কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। সরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার যাচাই-বাছাইয়ের এখতিয়ার বিইআরসির হলেও ব্যক্তিখাতের ক্ষেত্রে বিইআরসির সে এখতিয়ার নেই। ব্যক্তিখাতের গ্যাস ক্রয় চুক্তিও ব্যক্তিখাত বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির মতোই অস্পষ্ট, অস্বচ্ছ এবং অসম। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যক্তি ও সরকারি খাতের মধ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি হয়নি। বাজার ব্যক্তিখাত মনোপলির শিকার। তাতে অসাধু ব্যবসার প্রসার ঘটেছে এবং ভোক্তাস্বার্থ বিপন্ন হয়েছে। ফলে এনার্জির পাইকারি ও খুচরা বিক্রয় মূল্যহার নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনায়ন, ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিইআরসির জন্ম হলেও সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বিইআরসি আইনের সীমাবদ্ধতা ও বিইআরসির কর্মকাণ্ডে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের আইনবহির্ভূত হস্তক্ষেপ বিইআরসির স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে যেমন বিপন্ন করেছে, ভোক্তা অধিকারকেও তেমন বিপর্যয়ের মধ্যে রেখেছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে আছে। দশ. আপস্ট্রিম তথা জলে ও স্থলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রম জানা,  বোঝা বা বলার কোনো আইনি অধিকার বিইআরসির নেই। অথচ গ্যাস খাতে ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি করতে হবে  বিইআরসির। এখানেই বিপত্তি। অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রমে দেখা যায়, প্রতি হাজার ঘনফুট স্থলভাগের গ্যাসের মূল্য বাপেক্স পায় ২৫ টাকা। অথচ আইওসি পাচ্ছে ২৩০ টাকা (২ দশমিক ৯৮ ডলার), ২০১২ সালের চুক্তি মতে, গভীর সাগরের গ্যাসের জন্য পাবে ৩২৫ টাকা (৪ দশমিক ১৬ ডলার) এবং ২০১৪ সালের চুক্তি মতে, তা হবে ৫৪০ টাকা (প্রায় ৭ ডলার)। আবার এলএনজি হিসেবে আমদানিকৃত গ্যাসের মূল্যহার হবে ১ হাজার ১০০ টাকা (প্রায় ১৪ ডলার)। অথচ বাপেক্সের মূল্যহার ২৫ টাকা থেকে আর বাড়েনি। বাপেক্সের ব্যয়হার ৬৫ টাকা। সরবরাহকৃত মোট গ্যাসে তার গ্যাসের অনুপাত ৪ দশমিক ২৫ শতাংশের বেশি হয়নি। গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গঠনের পরও গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে নিয়োজিত দেশী কোম্পানির বিনিয়োগ ও  কারিগরি সক্ষমতা উন্নয়ন হয়নি। এ তহবিলের অর্থ বিইআরসির আদেশ ও প্রণীত নীতিমালা মতে ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিইআরসি সক্ষম হলে এসব দেশী কোম্পানির সার্বিক সক্ষমতা এত দিনে বিশ্বমানে উন্নীত হতো। সরবরাহকৃত গ্যাসে তাদের গ্যাসের অনুপাত বৃদ্ধি পেত। তাতে গ্যাসের সরবরাহ ব্যয়হার কম হতো। আয় উদ্বৃত্ত হতো। জ্বালানি খাতে সমৃদ্ধি আসত। কিন্তু এসব কোনো কিছুই হয়নি। এগারো. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সুষম প্রতিযোগিতা ও সমতা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। অথচ তা হয়নি। ব্যক্তিখাত বিনিয়োগ আকর্ষণের তাগিদে মুনাফার মার্জিন বৃদ্ধির নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে স্বল্পতম ব্যয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবারাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভোক্তারা মূল্যহার বৃদ্ধির মতো নাজুক পরিস্থিতির শিকার। বিইআরসি নির্বিকার। ভোক্তা পর্যায়ে তেলের মূল্যহার নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির। কিন্তু নির্ধারণ করে জ্বালানি বিভাগ। ব্যক্তিখাত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত জ্বালানি তেল তার মালিকানায় আমদানির সুযোগ পাওয়ায় সার্ভিস চার্জসহ তেলের দরপতন এবং শুল্ক ও ভ্যাট মুক্ত সুবিধা পায়। বিপিসির কাছে জ্বালানি তেল কেনায় সরকারি খাত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সেসব সুবিধা পায় না। এমন বৈষম্য প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি, অসাধু ব্যবসা প্রতিরোধ এবং ভোক্তাস্বার্থ ও অধিকার সুরক্ষায় বড় বাধা। সে বাধা সৃষ্টি করেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। বিইআরসি তা অপসারণে অপারগ ও সামর্থ্যহীন। বারো. পেট্রোবাংলার প্রস্তাবে ও জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনে গ্যাসের সম্পদ মূল্য ধারণা এবং সে মূল্যহার ২৫ টাকা নির্ধারিত হওয়া আইনি কর্তৃত্ববহির্ভূত হলেও বিইআরসি তাতে আপত্তি দেয়নি, গ্রহণ করেছে। বিইআরসির আদেশে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ২০১১ গঠিত হয়। সে নীতিমালা উপেক্ষা করে জ্বালানি বিভাগ স্বীয় বিবেচনায় ভিন্ন একটি গ্যাস উন্নয়ন তহবিল নীতিমালা ২০১২ প্রণয়ন করে ভোক্তাদের অর্থে গঠিত গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের ওপর অবৈধ দখল নিয়েছে এবং তহবিল গঠনের শর্ত লঙ্ঘন করে সে তহবিলের অর্থ ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। তাতে ভোক্তা অধিকার ও স্বার্থ খর্ব হচ্ছে। অথচ বিইআরসি তার প্রতিকার ও প্রতিরোধে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেনি। ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে এগিয়ে আসেনি। তেরো. তথ্য-প্রমাণাদিতে দেখা যায়, ২০০৮ সালের ৩০ জুন জ্বালানি বিভাগ নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের মূল্যহার বৃদ্ধি করে। তাতে বিইআরসি ঘটনা-উত্তর অনুমোদন দেয় এবং সেসঙ্গে জ্বালানি বিভাগকে অবহিত করে যে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের বিক্রয় মূল্যহার নির্ধারণের একক এবং একমাত্র এখতিয়ার বিইআরসির।  পরবর্তীতে জ্বালানি বিভাগ বিইআরসির আগাম সম্মতি নিয়ে তেলের মূল্যহার হ্রাসও করে। ওই বছর ১৫ অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় বিইআরসি-আইনের কতিপয় ধারা সংশোধনীর প্রস্তাব গৃহীত হয়। জ্বালানি তেল ও সিএনজির মূল্যহার নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির পরিবর্তে সরকার তথা জ্বালানি বিভাগের, এ প্রস্তাবটি ছিল তার মধ্যে অন্যতম। ওই আইন এ প্রস্তাব মতে সংশোধন হয়নি। অথচ জ্বালানি বিভাগ নির্বাহী আদেশে একদিকে এককভাবে জ্বালানি তেল ও সিএনজির মূল্যহার নির্ধারণ করে চলেছে, অন্যদিকে  বিইআরসি আইনি দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে নির্বাসিত হয়ে নির্বিকার রয়েছে। ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডিন ও অধ্যাপক।  সূত্র: বণিক বার্তা।
ক্যাটাগরি: মতামত
নিরাপদ হোক সিএনজি সিলিন্ডার
এপ্রিল ২০, ২০১৬ বুধবার ১০:২৪ পিএম - তৌশিকুর রহমান
রসায়নের ভাষায় জ্বালানি হিসেবে কার্যকারিতা নির্ধারণের অন্যতম নিয়ামক হলো ‘অকটেন নাম্বার রেটিং’। আর সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাসের (সিএনজি) ক্ষেত্রে এই অকটেন নম্বরের রেটিং ১৩০—যা কিনা জ্বালানি হিসেবে কার্যকারিতার দিক থেকে গ্যাসোলিনের থেকেও বেশি। আর পরিবেশবান্ধব ও স্বল্পমূল্য হওয়ায় বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় এই রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজি। আমাদের দেশেও তা নেহাত কম নয়। রাজধানীর কথাই ধরুন না। ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের গণপরিবহন, ট্যাক্সিক্যাব, অটোরিকশা কিংবা হিউম্যান হলার—সব বাহনেই সিএনজি সিলিন্ডারের বিকল্প ভাবা যেন দায়। দুর্ভাগ্য, এই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কয়েকটি অসাধু চক্রের হাতে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অননুমোদিত সিএনজি কনভারসন প্রতিষ্ঠান, এর সঙ্গে আছে অদক্ষ মেকানিকদের পাল্লায় পড়ে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা। আর এসব জায়গা থেকে সেবা নিতে গিয়ে বিপাকে পড়ছে সাধারণ মানুষ। যার খেসারত দিতে হয়েছে জীবনের মূল্য দিয়ে। সম্প্রতি কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা যেন সেই অসচেতনতা ও অসাধুতার প্রতিচ্ছবি। ঠিক কেন এই দুর্ঘটনা? কিংবা এর পেছনের কারণগুলোই বা কী? মুঠোফোনে কথা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিকৌশলে স্নাতক, বর্তমানে পেট্রিডেক এলপিজি ইন্ডাস্ট্রিয়ালের বিক্রয় ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. জাকারিয়া জালালের সঙ্গে। তাঁর কথায় উঠে এসেছে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ থেকে শুরু করে প্রতিকারের বিষয়গুলো। সঙ্গে পরামর্শ দিয়েছেন সিএনজি রূপান্তরের সময় কী কী বিষয়ে আমাদের লক্ষ রাখা উচিত কিংবা এই রূপান্তরের পরবর্তী সময়কার প্রয়োজনীয় যত্নের কথা। যেসব কারণে ঘটে দুর্ঘটনা দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ হলো নিম্নমানের কম পুরুত্ববিশিষ্ট সিলিন্ডার ব্যবহার করা। একই সঙ্গে পুরোনো অচল হয়ে যাওয়া সিলিন্ডারের পুনর্ব্যবহার—যেগুলো স্থানীয় গ্যারেজ কিংবা মেকানিকদের কাছ থেকে রূপান্তরের কাজ করানোর কারণে বাহ্যিকভাবে শনাক্ত করার উপায় থাকে না। অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে রূপান্তরের কাজ করালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই সরকার অনুমোদিত তথা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (সংক্ষেপে আরপিজিসিএল) স্বীকৃত কনভারসন প্রতিষ্ঠান থেকে অবশ্যই এই রূপান্তরের কাজ করানো উচিত। ওদিকে দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে সিলিন্ডারে অনেক সময় খুব ক্ষুদ্র ক্ষয় হয়ে থাকে, যেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু বিভিন্ন পরীক্ষায় বের হয়ে আসে। এই ক্ষয় থেকেও ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা।  সিএনজিতে রূপান্তরের সময় লক্ষ রাখতে হবে * নিজের সাধের গাড়িটি সিএনজিতে রূপান্তরের সময় অবশ্যই লক্ষ রাখা উচিত, যে প্রতিষ্ঠান থেকে রূপান্তর করানো হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানটি সরকার অনুমোদিত কি না। * যে সিলিন্ডারটি কিনবেন, তা যে দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে, সেটা স্বীকৃত উপায়ে হচ্ছে কি না। * প্রতিটি সিলিন্ডারের সঙ্গেই ওই সিলিন্ডারের নিজস্ব টেস্ট রিপোর্ট থাকে, যেটা কেনার সময় সবার উচিত সিলিন্ডারের নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে ওই টেস্ট রিপোর্ট সংগ্রহ করা এবং সব তথ্য মিলিয়ে দেখা। * যে কনভারসন কিট দিয়ে সিএনজি রূপান্তর করা হবে, তা আন্তর্জাতিক নীতিমালা মেনে চলে কি না। * যেসব কারিগর বা শ্রমিক এই রূপান্তরের কাজ করবেন, তাঁরাও আরপিজিসিএল থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কি না। পরবর্তী যত্ন যত্ন বলতে গ্যাস সিলিন্ডারের আলাদা করে খুব যত্ন নিতে হবে, তা কিন্তু নয়। তবে যেকোনো সিলিন্ডার চালু হওয়ার পর ন্যূনতম পাঁচ বছর পরপর একবার করে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার বিধান রয়েছে। যেটা আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেনে চলা হয় না। সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা থাকলে তা পরীক্ষায় বের হয়ে আসে এবং দীর্ঘমেয়াদি ওই সিলিন্ডার ব্যবহার করা সম্ভব হয়। খেয়াল রাখা উচিত, এই পরীক্ষা করানোর কাজও যেখান-সেখান থেকে না করিয়ে সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে করানো শ্রেয়তর। আর একটি বিষয়, সিলিন্ডার সংশ্লিষ্ট কোনো সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই নিজে থেকে কোনো কিছু না বুঝে করে দক্ষ মেকানিকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। থাকুন সতর্ক সাধারণত চলন্ত অবস্থায় দুর্ঘটনা ছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হওয়ার ঘটনা বিরল। গ্যাস নেওয়ার সময় তথা রিফিল করার সময় এই ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে থাকে বেশি। দুর্ঘটনা এড়াতে তাই নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর সতর্ক নজর রাখা জরুরি। * প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অনুমোদিত সিলিন্ডার রি-টেস্ট সেন্টার থেকে সিলিন্ডার পুনরায় পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া। * সিলিন্ডারের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ফিটনেস টেস্ট নিয়মিত চেক করা। * যে স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস রিফিল নেওয়া হবে, তার লেটেস্ট সেফটি চেক করা আছে কি না, তা জেনে নেওয়া। * গাড়িতে গ্যাস নেওয়ার সময় অবশ্যই গাড়ি থেকে নেমে নিরাপদ দূরত্বে অপেক্ষা করা। * গ্যাস নেওয়ার সময় স্টার্ট-কি খুলে রাখা। * গ্যাস রিফিল করার আগে ভালোভাবে চেক করা কানেকশন ঠিক আছে কি না। * বেশি গ্যাস নেওয়ার তাড়নায় কখনো ৩০০০ পিএসআইয়ের ওপর রিফিল না নেওয়া। * গ্যাস সিলিন্ডারের কোনো কাজ করাতে গেলে অবশ্যই তা বাহন থেকে খুলে নিয়ে সম্পূর্ণ গ্যাস বের করে দিয়ে তবে কাজ করতে দেওয়া। * সিএনজি গাড়িতে ধূমপান বা আগুন-সংশ্লিষ্ট কাজকর্ম থেকে বিরত থাকা। সূত্র: প্রথম আলো
ক্যাটাগরি: মতামত
বিদ্যুতের দাম কেন বাড়বে?
এপ্রিল ১৯, ২০১৬ মঙ্গলবার ০৮:২৭ এএম - ড. মুশফিকুর রহমান
জ্বালানি তেলের দাম কমানো হচ্ছে বলে সরকারের মন্ত্রী মহোদয়েরা বেশ কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন ফোরামে বলে আসছেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে পুরোপুরি মিলিয়ে সে দাম কমানো হচ্ছে না, সেটিও স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে। তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ হলেও সরকার রাখঢাক না করেই বলছে, জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান রাখা হবে। কেননা, এটা আয়ের একটা বড় জায়গা হয়েছে। তেল বিপণনের ব্যবসা সরকার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির মাধ্যমে বহাল রাখতে চায়। ২০১৪ সালের জুন মাসের পর থেকে ক্রমাগত দরপতন  হতে হতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের ব্যারেলপ্রতি মূল্য ৩০ ডলারের নিচে নেমে গেলেও সরকার স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের আগের নির্ধারিত উচ্চ বিক্রয়মূল্য অব্যাহত রাখে। অতীতে বিপিসি বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে অপেক্ষাকৃত কম দামে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করায় বিপিসির যে লোকসান হয়েছে, এবার সুযোগ আসায় সে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য জ্বালানি তেলের বেশি দাম বহাল রাখাকে সরকার যুক্তিযুক্ত বলছে। অবশ্য বিপিসি দাবি করেছে, তারা গত দেড় বছরে যত মুনাফা করেছে, তা দিয়ে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পরও বিপুল লাভের মজুত গড়েছে। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, বিপিসি ব্যাংকের দায় শোধ করলেও সরকারের কাছে পাওয়া ঋণ এখনো পরিশোধ করেনি এবং সে অঙ্কটি বিশাল। “গত ৩১ মার্চ থেকে প্রধানত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের ফার্নেস তেলের দাম প্রতি লিটারে ১৮ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে বিপিসি। দেশের বেসরকারি ১১টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি কম দামে ফার্নেস তেল নিজেরা আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ গত বছর থেকে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ২৭ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৮০ পয়সায় নেমে এসেছে।”     এত দিন সরকারের দায়িত্ববান ব্যক্তিরা তেল বিপণনে ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলে এলেও এখন বলছেন যে দুঃসময়ে বিপিসিকে ধার দেওয়া হয়েছিল। বিপিসি সেই ঋণের বদৌলতে বিশ্ববাজার থেকে বেশি দামে তেল কিনে দেশের বাজারে অপেক্ষাকৃত কম দামে বিক্রি করার লোকসানি ব্যবসা পরিচালনা করেছে। আগে সরকারের নির্দেশে সরকারি সংস্থা বিপিসি বেশি দামে তেল আমদানি করে কম দামে বিক্রির লোকসানি ব্যবসা করেছে; এখন সরকারি নির্দেশে কম দামে জ্বালানি তেল কিনে বেশি দামে বিক্রির দায়িত্ব পালন করছে। বিপিসির ব্যবসার ধরনটি সরকার জনগণকে জানানোর জন্য অবশ্যই সাধুবাদ পাবে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এখন ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারের ওপরে। দ্রুত তা ঊর্ধ্বমুখী হবে—এমন আভাস কেউ দেয়নি। জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশের বাজারে একই সমান্তরালে ওঠানামা করার ব্যবস্থা চালু করার মতো পরিপক্ব বাজার আমাদের এখনো গড়ে ওঠেনি। তাই আপাতত সরকার–নির্ধারিত মূল্যেই জ্বালানি তেলের বাজারমূল্য চালু থাকছে। গত ৩১ মার্চ থেকে প্রধানত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের ফার্নেস তেলের দাম প্রতি লিটারে ১৮ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে বিপিসি। দেশের বেসরকারি ১১টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি কম দামে ফার্নেস তেল নিজেরা আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ গত বছর থেকে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ২৭ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৮০ পয়সায় নেমে এসেছে। তবে বিপিসির কাছ থেকে লিটারপ্রতি ৬০ টাকা দরে অপর ১৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ফার্নেস তেল কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল। ফার্নেস তেলের নতুন মূল্য নির্ধারিত হওয়ায় এখন তেল পুড়িয়ে বিদ্যুতের উৎপাদন মূল্য আরও কমে আসার সুযোগ হলো। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, এবার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল, অকটেনের দামও খানিক কমবে। “তবে আমদানি করা গ্যাস দেশে উৎপাদিত গ্যাসের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হবে। ফলে গ্যাসের দাম সমন্বয় প্রায় অবশ্যম্ভাবী। গত ৩০ মার্চ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সরকারের বড় অঙ্কের ‘ভর্তুকি’র বোঝা কমাতে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করতে হবে।” দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প-কারখানার প্রধান জ্বালানি হিসেবে এখনো প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা প্রকট। দেশের আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত দ্রুত নিঃশেষিত হয়ে আসছে বলে সরকার তরলীকৃত জ্বালানি গ্যাস (এলএনজি) আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১০ সাল থেকে এলএনজি আমদানির আলাপ অব্যাহত রয়েছে। আমদানি করা তরল গ্যাস জাহাজ থেকে নামিয়ে সংরক্ষণ ও তা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে সঞ্চালনের অবকাঠামো (এলএনজি টার্মিনাল) না থাকায় সে আলোচনা কার্যকর হয়নি। গত ৩১ মার্চ পেট্রোবাংলা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ঘোষণা অনুযায়ী, ২০১৮ সালে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে কাতার থেকে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস আমদানি করে দেশের গ্রাহকদের সরবরাহ করা হবে। সরকার দেশে আরও কয়েকটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও এলএনজি আমদানির উদ্যোগকে উৎসাহিত করছে। তবে আমদানি করা গ্যাস দেশে উৎপাদিত গ্যাসের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হবে। ফলে গ্যাসের দাম সমন্বয় প্রায় অবশ্যম্ভাবী। গত ৩০ মার্চ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সরকারের বড় অঙ্কের ‘ভর্তুকি’র বোঝা কমাতে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করতে হবে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে বছরে পাঁচ থেকে সাত হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এবং সরকারকে এ ভর্তুকি তিন থেকে পাঁচ বছরে সমন্বয় করতে হবে। ইতিমধ্যে সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে জমা দিয়েছে। বিইআরসি কোম্পানিগুলোর উত্থাপিত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দাবির যৌক্তিকতা পরীক্ষা করছে। দাম বাড়ানোর দাবি পুরো কার্যকর হলে খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে তা প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। জ্বালানি তেলের দাম কমায় গড়ে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমার কথা। তা ছাড়া বড় বড় কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। সেগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কম এবং দক্ষতা তুলনামূলক বেশি। সুতরাং স্বল্পমূল্যে অধিক দক্ষতায় যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমর্থ, সেগুলো বেশি চালিয়ে বিদ্যুতের গড় উৎপাদনমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ আছে। আদৌ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হবে; নাকি পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করে খুচরা গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের সরবরাহ মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হবে, সেটি দেখার বিষয়। তবে ব্যবসার স্বচ্ছতার স্বার্থে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের সূচকগুলো গ্রাহকের কাছে স্পষ্ট করতে পারে। ড. মুশফিকুর রহমান: খনি প্রকৌশলী, জ্বালানি ও পরিবেশ-বিষয়ক লেখক। সূত্র: প্রথম আলো    
ক্যাটাগরি: মতামত
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অফুরন্ত সম্ভাবনা
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৬ শনিবার ০৯:৫৫ পিএম - ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব
বাংলাদেশে সোলার প্যানেল সাধারণত চীন থেকে আমদানি করা হয়, তবে এখন দেশেও প্যানেল তৈরি, এলইডি অ্যাসেম্বলিং, চার্জ কন্ট্রোলার তৈরির মতো কাজ শুরু হয়েছে। ছয়টি প্রতিষ্ঠান এখন সোলার প্যানেল উৎপাদন করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডকলের আর্থিক সহায়তায় ছোট বড় প্রায় ৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এ খাতে কাজ করছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাসোসিয়েশন হলো ‘বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন’ বা বিএসআরইএ। সার্বিক সমন্বয়ে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)। বর্তমানে মাসে আনুমানিক ৮০ হাজার সোলার হোম সিস্টেম বিক্রি হচ্ছে। ২০১২ সালে সংখ্যাটি ছিল অর্ধেক। এখন পর্যন্ত সারা দেশে এনজিওর মাধ্যমে ৪০ লাখেরও বেশি সোলার হোম সিস্টেম ইনস্টল করা হয়েছে। বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানি সেচে সোলার বেজড সাবমারজিবল পাম্পের পাইলট প্রকল্প নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্প প্রকল্পের সাফল্য ও অভিজ্ঞতা আমাদের দেশে ফসলের জমিতে সেচে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধির সুযোগ বাড়াবে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘গ্রামীণ শক্তি’ ব্যক্তি পর্যায়ে সোলার সলিউশন, সোলার ব্যবসা এবং নতুন নতুন খাতে সোলার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পাইলট পরিচালনার অগ্রদূত। সোলার প্যানেল স্থাপন-বিষয়ক পরামর্শ প্রদানে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো)কয়েকটি সেল খুলেছে, যেগুলো কর্মপ্রক্রিয়ায় যাওয়ার অপেক্ষায়। ডেসকোর নিজস্ব দফতর ও সাবস্টেশনসহ গ্রাহক পর্যায়ে সোলার সিস্টেম স্থাপন শুরু হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যের ভিত্তিতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ২০ হাজারের অধিক সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করেছে। পিডিবিও সৌর প্লান্ট স্থাপনে উদ্যোগ নিয়েছে। নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে পাঁচ বছরের জন্য সরকারিভাবে আয়কর মওকুফ করা হয়েছে। বিএসআরইএ ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কাছে সৌরশক্তির সুবিধা পৌঁছে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করছে। সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে সহায়তা করছে জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা জিআইজেড। সোলার প্যানেলে মূল্য বেশি হওয়ায় শুরুতে ভর্তুকিও দিচ্ছে জিআইজেড। সোলার প্যানেল কেনার সুবিধা থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ সহজেই সেগুলো ব্যবহার করতে পারছে। বাড়িতে ‘সৌর ছাদ’তৈরি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে।  বাড়ির ছাদ বা চালে সৌর প্যানেল স্থাপন করে হোম পাওয়ার সিস্টেম চালু করা যেতে পারে, বিশেষ করে পাকা ছাদের ওপর, যার সংখ্যা মোট বাড়িঘরের ১০ শতাংশের ওপর। সৌরশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রির উদ্যোগ নিয়ে  ৫০কিলোওয়াট পিক এর একটি পাইলট প্রকল্প করছে বেসরকারি সংস্থা রহিম আফরোজ রিনিউয়েবল  এনার্জি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে ঢাকার সচিবালয়ের ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়েছে। তাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১৯.৯৫ টাকা দরে কিনছে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ (ডিপিডিসি)। সৌরশক্তি খাতের সমস্যা বর্তমানে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ আবেদনের সঙ্গে ৩ শতাংশ বিদ্যুৎ সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সোলার প্যানেল স্থাপনের নামে শুভঙ্করের ফাঁকি চলছে। সোলার প্যানেল না বসিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকদের ঘুষ দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া করে এনে সোলার প্যানেল বসানো হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনের পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেই সেগুলো সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ কম দামে নিম্নমানের সোলার প্যানেল বসাচ্ছে শুধু বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে। যেগুলো অল্পদিনেই অকেজো হয়ে পড়ছে। ১. প্রায়ই দেখা যায় চীন থেকে আমদানিকৃত নিম্নমানের সোলার প্যানেল অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ২০-২৫-৩০ বছরের লাইফ সাইকেলের কথা মৌখিকভাবে বলা হলেও অকেজো প্যানেলের প্রতিস্থাপন করা হয় না, ব্যক্তি গ্রাহকের সঙ্গে বিধিবদ্ধ বিজনেস ডিল থাকে না। মৌখিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে প্যানেল পারফরম্যান্স অসামঞ্জস্যপূর্ণই থাকে। ২. (ক). কারিগরি বিষয়ে অনভিজ্ঞ গ্রাহকের কাছে উপস্থাপনের জন্য অতি সরল সোলার সলিউশনের (প্যাকেজ) অভাব রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন কোয়ালিটির বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম (বাতি/সিএফএল বাল্ব, পাখা, সেচ পাম্প, ডেস্কটপ ল্যাপটপ কম্পিউটার, টিভি ইত্যাদি) ব্যবহারের বিপরীতে প্যানেল/ব্যাটারি ইত্যাদির দরকারি ক্যাপাসিটির অসামঞ্জস্য থাকে। কিছু ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল ব্যাপারে বিধিবদ্ধ বিজনেস এথিকস না থাকায় গ্রাহক সন্তুষ্টি এবং নতুন গ্রাহক সৃষ্টিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ২. (খ). প্যানেল ক্যাপাসিটির সঙ্গে ব্যাটারির ক্যাপাসিটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে প্রায়ই, তদুপরি ব্যাটারির লাইফ সাইকেল বছরে বলা হয় কিন্তু ব্যবহার ঘণ্টায় বুঝিয়ে দেয়া হয় না। ফলে বেশি ব্যবহারে তিন বছরের প্রতিশ্রুত ব্যাটারি এক থেকে দেড় বছরেই কর্মঘণ্টা ফুরিয়ে যায়, যা গ্রাহক পর্যায়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। নিম্নমানের ব্যাটারি সাপ্লাই করা এ খাতে অসাধু ব্যবসায়ীদের মিল্কিং কাউ। প্যানেল ঠিক থাকে কিন্তু ব্যাটারি সার্ভিসিং কিংবা একেবারেই পাল্টানো দরকার হয়ে পড়ে। ফলে আর্থিক দিক দিয়ে সোলার বেশ খরুচে হয়ে ওঠে— প্রাথমিক বিল্ডআপ কস্ট এবং ব্যাটারি মেইনটেন্যান্স কস্ট— এ দুই মিলিয়ে। উল্লেখ্য, উন্নত মানের সোলার প্যানেল এবং উচ্চমান ব্যাটারির ক্ষেত্রে মেইনটেন্যান্স খুবই গ্রাহকবান্ধব। বিজনেস কেইস, সাধারণত একটি ছোট গ্রামীণ পরিবারের শুধু কয়েকটি বাতির জন্য ৪০-৫০ ওয়াটের সোলার হোম সিস্টেম লাগে। এ ক্যাপাসিটির মধ্যম মানসম্পন্ন কমপ্লিট সোলার সলিউশন অ্যাক্টিভ এবং প্যাসিভ কস্ট মিলে ১২ হাজার টাকার মতো পড়ে, পরিবারটি যদি পল্লী বিদ্যুতের বিল ৮০ টাকা করে (পিক আওয়ার লোড শেডিং বিবেচনায় এটিই এ ধরনের পরিবারের এভারেজ বিল!) দিয়ে থাকে তাহলে এ খরচ পোষাতে সাড়ে ১২ বছর লাগে। কিন্তু কিস্তিতে কিনলে এ সময় ন্যূনতম ২০ বছরে ঠেকে। বিএসআরইএর তথ্যেও এ চিত্র উঠে আসে। সুতরাং এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি উঠে আসা ব্যবসায় বিজনেস এথিকস পালন (উচ্চমানসম্পন্ন ইকুইপমেন্ট ডেলিভারি এবং অনেস্ট মেইনটেন্যান্স লেভেল) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় হোম সোলারের এ খাতে নতুন পটেনশিয়াল গ্রাহক আকৃষ্টকরণ দুরূহ হয়ে পড়বে। ৩. অভিযোগ আছে, অ্যান্টি-ডাম্পিং নীতিমালা থাকা দেশগুলো (যেমন— ইউএসএ) থেকে চীনা কোম্পানিগুলো অকেজো প্যানেল ফেরত এনে সামান্য মেরামত করে বাংলাদেশে ফাইনাল ডাম্পিং করা হচ্ছে। এতে সোলার হ্যাজার্ড তৈরি হচ্ছে। ৪. লোভনীয় কিন্তু অতি জটিল কিস্তির ফাঁদ, তদুপরি প্রতিস্থাপন গ্যারান্টি ঝামেলাপূর্ণ। ৫. সরকারি অফিসের ছাদে প্যানেলের কার্যকারিতা, প্রতিশ্রুতির বিপরীতে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের গ্যারান্টি ক্লজ না থাকায়, অতি খরুচে সোলার সিস্টেম বসানো হচ্ছে কিন্তু তার উৎপাদন এবং ব্যবহার কী পরিসরে হচ্ছে, তার বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য নেই। ফলে এসব প্রকল্প রাজনৈতিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের আরেকটি উর্বর খাত হয়ে উঠতে পারে। এসব কারণে বাংলাদেশ সোলার খাত থেকে সমন্বিত সুফল পাচ্ছে না। ব্যক্তিপর্যায়ে বিদ্যুত্হীন দূরবর্তী গ্রামের নাগরিকরা সন্ধ্যায় সামান্য আলো জ্বালানোর বিদ্যুৎ পাচ্ছেন, সোলার খাতের সাফল্য এখানেই সীমাবদ্ধ। ব্যক্তি পর্যায়ে সোলার সলিউশন: প্রকারভেদ সৌরবিদ্যুৎ তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তিন ধরনের হোম পাওয়ার সিস্টেম পাওয়া যায়। ১. গ্রিড সংযুক্ত সিস্টেম (গ্রিড টাই আপ সিস্টেম) ২. ব্যাটারি ব্যাকআপসহ গ্রিডে সংযুক্ত সিস্টেম ৩. সোলার হোম সিস্টেম গ্রিড টাই আপে তৈরি বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে খরচ কমানো যায়। যতটুকু গ্রিডে সরবরাহ হবে, সে পরিমাণ বিদ্যুৎ মোট ব্যবহার থেকে বাদ দিয়ে বিল দিতে হয়। (বাংলাদেশে সম্প্রতি স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান গ্রিড সংযুক্ত সিস্টেম স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ থেকে প্রতি বছর ৭৫ মেগাওয়াটঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।) ব্যাটারি ব্যাকআপসহ গ্রিডে সংযুক্ত হোম মডেল একটু উন্নত, কোনো কারণে গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া না গেলে ব্যাটারিতে সংরক্ষিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাবে। সোলার হোম পাওয়ার সিস্টেমই বাংলাদেশের বাজারে প্রাধান্য পেয়েছে। তবে স্মার্ট গ্রিড (অত্যাধুনিক কন্ট্রোল সিস্টেম বেজড বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো, যা বাংলাদেশে নেই) থাকলে গ্রিড টাইড আপ হোম সোলার সিস্টেমকে এক নতুন মাত্রা দেয়া যায়, যেখানে গ্রাহক পর্যায়ে ব্যবহারের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ন্যাশনাল কিংবা লোকাল বা কমিউনিটি গ্রিডে সরবরাহ করে ব্যবসায়িক উপার্জনের পথ সুগম হয়। সোলার হোম সিস্টেমের চ্যালেঞ্জ ১. সরল প্যাকেজ, শুধু উচ্চমানের পণ্য আমদানি কিংবা উৎপাদন। মেইনটেন্যান্সের নিশ্চয়তা, কথা ও কাজে মিল থাকা গ্যারান্টির নিশ্চয়তা বিধান করা।  ২. এনজিও/ব্যবসায়ীদের বিজনেস এথিকস মানতে বিজনেস রেগুলেশন প্রণয়ন, গ্রাহক কমপ্লেইন মনিটরিং সিস্টেম ডেভেলপ, এনজিও নির্ভরতা কাটিয়ে কাস্টমার বেনিফিট দিতে ওয়ান স্টপ সহায়তা সেল, সাপ্লাইয়ের মান যাচাইয়ের সার্টিফিকেশন, গ্রাহক সন্তুষ্টি যাচাই ব্যবস্থাপনা ডেভেলপ করা। ৩. রিসাইকেল বেজড, লোকাল রি-প্রডিউসিং বেজড গ্রিন এনার্জির প্রণোদনা ডিফাইন করা। ৪. ইলেকট্রনিক হ্যাজার্ড দূরীকরণ নির্ভর সেন্ট্রাল সোলার ওয়েস্ট প্রসেসিং প্লান্ট তৈরি করা, সাপ্লাইয়ারদের অকেজো প্লান্ট রিটেকের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। ৫. সেচকাজে অতি আকর্ষণীয় সোলার মডেল ডেভেলপ, যা কৃষকবান্ধব অর্থাৎ কৃষি উৎপাদন খরচ সীমিত রাখার অনুকূল। ৬. সোলার ব্যবসাকে শুধু হোম বেজড সলিউলশনে সীমাবদ্ধ না রেখে, স্মার্ট গ্রিড পরিকল্পনা এবং ইমপ্লিমেন্টেশন করে, ব্যক্তির প্যানেলকে স্মার্ট গ্রিড টাই আপের ব্যবস্থা করা, যাতে ব্যক্তির ব্যবহার এবং এ থেকে উপার্জনের উৎস তৈরি করা যায়। ৭. উন্নত ব্যাটারিসহ, কনভার্টার, চার্জ কন্ট্রোলার সিস্টেম লোকালি ডেভেলপ করে বা মেইনটেন্যান্স ফেসিলিটি বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া। ৮. ব্যক্তি গ্রাহককের উৎপাদন ছোট ছোট স্থানীয় গ্রিড অবকাঠামো ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা করে দেয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সরাসরি অন্য গ্রাহক এবং ডেসকো/পিডিবির কাছে বিক্রির অধিকার দেয়া। ব্যক্তিগত খাতের সোলারকে এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি গ্রিডে সরবরাহ (বিক্রি), ন্যাশনাল গ্রিডে বিদ্যুৎ প্রদানের মতো সঞ্চালন অবকাঠামো (গ্রিড টাই আপ) সুযোগ দিলে অনেকেই এ খাতে বিনিয়োগ করবে। সেজন্য ব্যাপক সঞ্চালন (পাওয়ার ট্রান্সমিশন) প্রিপারেশন দরকার, স্মার্ট গ্রিড দরকার। ৯. এসি টু ডিসি, ডিসি টু এসি ডুয়াল কনভার্শন ড্রপ রোধ এবং কনভার্টার কস্ট কমানোর লক্ষ্যে সরাসরি ডিসি বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের স্থানীয় উৎপাদন, আমদানি সহজীকরণের গাইডলাইন, রোডম্যাপ তৈরি করা। ১০. বাড়ির ছাদে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সোলার প্লান্টের বিপরীতে একাধিক পরিবার বা বাড়িতে সমন্বিত প্লান্টের অনুকূলে নীতিমালা তৈরি করা, সঞ্চালন সাপোর্ট দেয়ার জন্য কমিউনিটি সঞ্চালন অবকাঠামো নিয়ে পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনা চালু। ১১. লোকাল ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিকে বিভিন্নভাবে প্রমোট করা। গ্রিন এনার্জিকে প্রমোটের বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ নেয়া, যাতে সিটিজেন রেসপন্সিবিলিটি ছড়িয়ে দেয়া যায়। ১২. পিক অফ পিক রেটে ভিন্নতা আনা দরকার, যাতে পিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করা যায়। ১৩. সোলার নিয়ে রিসার্চ ইনস্টিটিশন, বিশ্ববিদ্যালয় ও করপোরেট পর্যায়ে গবেষণার দ্বার উন্মুক্তকরণ। এ খাতে উল্লেখযোগ্য ফান্ড বরাদ্দ দেয়াও সময়ের প্রয়োজন। সোলার ইরোডিয়েন্স বা সৌর দেদীপ্যমানতা: বাংলাদেশের অফুরন্ত সম্ভাবনা সোলার ইরোডিয়েন্স সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান মাঝামাঝি থেকেও কিছুটা ওপরে, বলা চলে ইউরোপের অনেক ওপরে। নিচের ছবিতে দেখুন: (http://www.greenrhinoenergy.com/solar/radiation/empiricalevidence.php) এমনকি শীতের সময়ও গড় দিন দৈর্ঘ্য ইউরোপ থেকে আমাদের অনেক বেশি, উপরন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রধান ঋতু গ্রীষ্মের মেরুকরণ (দীর্ঘায়ন) হচ্ছে এবং রোদের সময়কাল ও প্রখরতা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে সোলার ইরোডিয়েন্সের প্রভাব আসতে সময় লাগবে কেননা এ ডাটা ন্যূনতম ২০ বছরের এভারেজ। তুলনামূলক উদাহরণ: সোলার ইরোডিয়েন্স কিংবা সোলার ইন্সুলেশন ফিগার জিও লোকেশন, বাড়ির দিক, সূর্যের গতিপথের সঙ্গে ছাদের সমান্তরালতা, হেলানো কিংবা ঢালাই ছাদ, প্যানেলের কৌণিক পজিশন ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে, যা বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন হয়। সাধারণ সামার মাসগুলোয় সোলার ইরোডিয়েন্স বেশি, উচ্চ ইরোডিয়েন্স উচ্চ সৌরশক্তি উৎপাদনের মাত্রা নির্দেশ করে। জার্মান-নেদারল্যান্ডস-বেলজিয়াম সীমান্ত শহর মাসট্রিকট বনাম কুমিল্লার সোলার ইরোডিয়ান্স তুলনায় দেখা যাচ্ছে, গড় ইন্সুলেশন ফিগার কুমিল্লায় ১ হাজার ৪৭৫ বেশি। অর্থাৎ একই প্যানেলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন মাসট্রিকট থেকে কুমিল্লায় ১ হাজার ৪৭৫ গুণ বেশি হবে (আইডিয়াল হিসাব, সামান্য তারতম্য হতে পারে)। উল্লেখ্য, মাসট্রিকটে বাড়ির ছাদে প্যানেল খুবই জনপ্রিয়, যা গ্রিড টাইড আপ! সরল ব্যাখ্যা ফর্মুলা- Stated wattage of panel x 75% x monthly insolation figure = average daily power উদাহরণ, ১০০ ওয়াটের একটি প্যানেল ৭৫ শতাংশ প্রডাক্ট রেটেড সিস্টেম ইফিশিয়েন্সিতে মাসট্রিকট শহরে বার্ষিক গড় ৩ দশমিক শূন্য ৪ ইন্সুলেশন ইনডেক্সের অনুকূলে মাত্র ২২৮W/h/day সৌরশক্তি দেবে, কিন্তু এই একই প্যানেলে কুমিল্লায় বার্ষিক গড় ৪ দশমিক ৫২ ইন্সুলেশন ইনডেক্সের অনুকূলে ৩৩৯ W/h/day সৌরশক্তি দেবে। অর্থাৎ ১১১W/h/day বেশি শুধু একটি ১০০ ওয়াট প্যানেলেই! এই একটি সরল গানিতিক উদাহরনই বাংলাদেশের অমিত সৌর সম্ভাবনাকে ব্যাখ্যা করে। সামনে এগিয়ে যাওয়া: কোন মডেলে সমাধান? সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু, বায়োমাস, হাইড্রো, বায়োফুয়েল, জিওথার্মাল, নদীর স্রোত ও সমুদ্রের ঢেউ বাংলাদেশের সম্ভাব্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস খুঁজছে বাংলাদেশ। উইন্ড সার্ভে ম্যাপিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থা খুব খারাপ, পাইলট উইন্ড প্লান্টে দেখা গেছে, প্রায় সময়ই পাখা ঘোরেই না! বাতাসের গতিবেগের সঙ্গে কিউবিক রিলেশনে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় বলে আমাদের উইন্ড এনার্জির ভবিষ্যাৎ আসলেই নাজুক। বায়োমাস এবং ল্যান্ড ফিল ওয়েস্ট গ্যাস বাংলাদেশে খুব ছোট এবং মধ্য পরিসরে কার্যকর হতে পারে কিন্তু দুঃখজনক হলো, এ খাতগুলো অনাবিষ্কৃত। এদিকে বায়োগ্যাস জনপ্রিয়তা পায়নি ঠিক কিন্তু বায়োমাস ও বায়োগ্যাসের লিকুইডিফিকেশন নিয়ে পাইলটও হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে ধানের তুষ (রাইস হাস্ক) থেকে গ্যাসিফিকেশন পদ্ধতিতে অতি স্বল্প পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাইলট হয়েছে, কিন্তু তুষের বিকল্প ব্যবহার থাকায় তা বেশি দূর এগোয়নি। স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা থাকা নদীর মোহনায় সমুদ্রস্রোত কাজে লাগিয়ে আধুনিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে কথা হয়েছে সামান্য, কিন্তু এ ধরনের প্রকল্পের সমীক্ষা হয়নি। পাইলটের পরেই শুধু বোঝা যাবে— কী পরিমাণ পটেনশিয়াল রয়েছে এ খাতে। একই কথা প্রযোজ্য বার্জ মাউন্টেইন টাইপ প্রকল্পের বেলায়, কাপ্তাই প্লান্টে এ প্রকল্পের সমীক্ষা এবং পাইলট করা যায়। উদ্ভাবনী এসব খাতে বিলম্ব দুঃখজনক। ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, টেকনিক্যাল আর্কিটেক্ট, ভোডাফোন নেদারল্যান্ডস।
ক্যাটাগরি: মতামত
নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে পারে ভবিষ্যত সঙ্কট মোকাবেলায় নতুন হাতিয়ার
জানুয়ারি ১২, ২০১৬ মঙ্গলবার ১০:৩০ পিএম - হাসান কামরুল
গ্রামীণ অর্থনীতিতে জ্বালানিই মুল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। মোট দেশজ উৎপাদনের পিছনে জ্বালানির সহজলভ্যতার রয়েছে অগ্রণী ভূমিকা। বাংলাদেশের জনপদে জ্বালানির চাহিদা ও প্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। প্রাকৃতিক গ্যাসের রয়েছে সামষ্টিক সীমাবদ্ধতা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসই জ্বালানি ব্যবস্থার মূল উপাদান হিসেবে বিবেচ্য। আর এ সীমাবদ্ধতা প্রকট হবে যদি বিদ্যমান গ্যাসের মজুদ ২০২০ সালের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যায় কিংবা নতুন কোন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা না গেলে বাংলাদেশকে প্রচলিত চাহিদা মিটাতে আমদানি নির্ভর হতে হয়। তাই এ সমস্যা বা সঙ্কটকে মোকাবেলা করতে হলে বিকল্প জ্বালানির উৎস অনুসন্ধান অনস্বীকার্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে পারে ভবিষ্যত সঙ্কট মোকাবেলায় নতুন হাতিয়ার। প্রচলিত জ্বালানি ব্যবস্থার প্রায় ২৪শতাংশই আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। যদিও সরকার ইতিমধ্যেই ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে ৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে। যার ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট আসছে সরকারিভাবে আর বাকি ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপন্ন হচ্ছে বেসরকারি পর্যায়ে। যা আনুপাতিক হিসেবে সরকারিভাবে ৪৭ শতাংশ ও বেসরকারি পর্যায় থেকে ৫৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে। তবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এখনো চাহিদা পূরণে অসমর্থই রয়ে গেছে। বায়ো, সোলার, বায়ুশক্তি, টাইডাল পাওয়ার ও হাইড্রো এখন পৃথিবীজুড়েই ক্রমাগতভাবেই জনপ্রিয় হচ্ছে। এ ধরনের প্রকল্প থেকে বাংলাদেশেও সহজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। যার জন্য প্রয়োজন সরকারের আন্তরিকতা ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ। বায়োগ্যাস বায়োগ্যাস মূলত মিথেন (৬০-৭০শতাংশ) ও কার্বন ডাই অক্সাইড (৪০-৩০শতাংশ) উপাদানে মিশ্রিত। বাংলাদেশে বায়োগ্যাসের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল জনগোষ্ঠির গ্রামীণ জনপদ। আর এ জনপদে রয়েছে গৃহপালিত গবাদি পশু যা থেকে বায়োগ্যাসের মূল উপাদান কাউ-ডাং বা গোবর সংগ্রহ করা যায় অনায়াসে। এক হিসেবে দেখা গেছে বৃহৎ ৬টি সিটি করর্পোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ৭,৯৬০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এ বর্জ্য রাসায়নিক উপাদানে সমৃদ্ধ যার প্রায় ৭৪ শতাংশ জৈব উপাদান, ৯ শতাংশ পেপার, ৪ শতাংশ প্লাস্টিক, ২ শতাংশ টেক্সটাইল ও কাঠ এবং ১ শতাংশ অন্যান্য উপাদান মিশ্রিত হওয়ায় এ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে অতি সহজেই বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা যায়। সৌরালোক শক্তি সৌরশক্তি ব্যবহার সবচেয়ে সহজ ও সস্তা এবং নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব। ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এমন একটি জায়গায় অবস্থিত যেখানে বছরের অধিকাংশ সময়ই সূর্যের আলোর প্রখরতা বিদ্যমান। বাংলাদেশের প্রতি বর্গমিটার এলাকায় প্রতি ঘন্টায়  প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৬ দশমিক ৫কিলোওয়াট আলোকরশ্মি পরিলক্ষিত। বছরের মার্চ -এপ্রিল এ দুই মাস সূর্যের আলোর প্রখরতা সবচেয়ে বেশি থাকে এবং ডিসেম্বর ও জানুয়ারি দুই মাস সূর্যের আলোকরশ্মির নিম্মগামিতা বিদ্যমান। আর বাদ বাকি সময়গুলোতে যে পরিমাণ সূর্যরশ্মি বাংলাদেশে পৌঁছে তা শক্তিতে সঞ্চারিত করা গেলে বিশাল শক্তির উৎসের নিশ্চয়তা প্রদান সম্ভব। যদিও সোলার প্যানেল স্থাপন এখনো সহজতর করা যায়নি। তবুও সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সংস্থা সোলার এনার্জির কর্মাশিয়াল উৎপাদনে সচেষ্ট রয়েছে। বায়ুশক্তি বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরীয় উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১৪ কিমি। মৌসুমি বায়ুর আধিক্য রয়েছে পুরো উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে। দক্ষিণ/দক্ষিণ পশ্চিম রেখাবরাবর মৌসুমি বায়ু সাধারণত উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে বয়ে যায়। সাধারণত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাতাসের গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩মিটার থেকে ৬ মিটার। এবং বায়ুর গতি সাধারণত ‘ভি’ আকৃতির হয়ে উপকুলীয় অঞ্চলজুড়ে পরিলক্ষিত হয়। মার্চ মাসে টেকনাফে বাতাসের গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩মিটার যা সেপ্টেম্বরে ২০মিটার। একইভাবে কুয়াকাটা, মংলা, কুতুবদিয়া,সন্দীপ ও সেন্টমার্টিন এলাকায় মার্চে বাতাসের গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ থেকে ৫ মিটার ও সেপ্টেম্বরে ২৬ থেকে ৮০ মিটার প্রতি সেকেন্ডে। এ ধরনের বাতাসের গতিতে অতি সহজেই ছোট ছোট বায়ুকল গড়ে তোলা যেতে পারে। কুতুবদিয়ায় অবস্থিত বায়ুকলটিও যথাযথ রক্ষাণাবেক্ষণের অভাবে সঠিকভাবে উৎপাদনে নেই। টাইডাল পাওয়ার সমুদ্রতটের উচ্চতার হেরফেরই টাইডাল পাওয়ার উৎপাদনের মুল নিয়ামক। বাংলাদেশে প্রায় ৭১৪কিমি এলাকাজুড়ে সমুদ্র উপকুলীয় অঞ্চল রয়েছে। কোস্টাল জোন পলিসি অনুসারে ১৯টি উপকূলীয় জেলার মধ্যে ১২টি জেলার রয়েছে সরাসরি সমুদ্র সংযোগ। এসব এলাকাজুড়ে টাইডাল পাওয়ার প্লান্ট গড়ে তোলা যেতে পারে। ছোট ছোট এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অতি সহজেই উপকুলীয় অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া সম্ভব। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার ফলে সামুদ্রিক ঝড় ও সাইক্লোনের পরিমাণ ও সংখ্যা কমিয়ে আনা সহজ এবং উপকুলীয়বাসীদের জানমাল রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। আইলার মতো সামুদ্রিক দুর্যোগের পর সরকারিভাবে উপকুলীয় অঞ্চলে বাধ, ব্যারেজ ও স্লুইজগেইট নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব ইনফ্রাস্ট্রাকচারকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যবহার করে ২ থেকে ৮ মিটার টাইডাল হেড থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এধরনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নবায়নযোগ্য। প্রয়োজন অনুযায়ী, এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সহজে বন্ধ করা ও স্থান্তান্তর করা সহজ বিধায়  আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নেই বললেই চলে। সমুদ্রের এ প্রাকৃতিক শক্তিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে একদিকে যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানির অফুরন্ত দ্বার উম্মোচন হবে অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের জনপদকে নিরাপদ ও আধুনিক জীবন উপহার দেয়া সম্ভব। জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশ ছোট বড় হাজারো নদীর দেশ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমতট ভূমি। পদ্মা মেঘনা যমুনার প্রবাহের উপর নির্ভরশীল এখানকার জনজীবন। এতো বেশি স্বাদু পানির উৎস পৃথিবীর খুব কম জায়গায়ই দেখা যায়। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার উৎস প্রবাহ পুরো দেশকে পুর্ব-পশ্চিম কোনে বিভক্ত করেছে। যা থেকে প্রতিবছর ১দশমিক ৭৩ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার পানি প্রবাহ দেশজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করে। ৫৭টিরও বেশি ট্রান্সবাউন্ডারি নদী রয়েছে। এসব নদীর উৎস ভারত ও মিয়ানমার থেকে। মৌসুমি বায়ুর আধিক্যকালে এসব নদীতে পানির প্রবাহ অতি উচ্চ হওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের এক অবারিত সুযোগ রয়েছে। নদী ভিত্তিক জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এখনো পর্যন্ত গড়ে উঠেনি। তবে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পাহাড়ি উৎস থেকে আসা জলের উপর নির্ভরশীল। যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট। তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সম্প্রতি এ কেন্দ্রটির ৫টি উইংসকে শক্তিশালী করার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। যা থেকে ৩৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে বোর্ড আশা করছে। বাংলাদেশ জুড়েই রয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট নদী  নালা ও পাহাড়ি অঞ্চলে বিদ্যমান ছোট ছোট পানির ঝর্ণা বা ওয়াটার ফলস যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে আগামি কয়েক বছরে জলবিদ্যুৎ থেকে এক হাজার মেগাওয়াটের উপর বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হবে। এসব ছোট ছোট উৎসকে আমলে নিয়ে চার ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। পিকো হাইড্রোপাওয়ার যা থেকে ৫কিলোওয়াট ঘন্টা, মাইক্রো হাইড্রোপাওয়ার যার থেকে ৫কিলোওয়াট থেকে ৩০০কিলোওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। মিনি হাইড্রোপাওয়ার থেকে ৩০০কিলোওয়াট থেকে ৩ মেগাওয়াট ও স্মল হাইড্রোপাওয়ার থেকে ১০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ অতি সহজেই উৎপাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে বিদ্যুতের নিশ্চয়তা প্রদান জরুরি। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার যে কর্মসূচি সরকারের রয়েছে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিকল্প জ্বালানির উৎস অনুসন্ধান জরুরি। কেননা প্রত্যন্ত অঞ্চলে এধরনের ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে অতি সহজেই সেসব এলাকাকে  বিদ্যুতের আওতায় এনে আলোকিত করা সম্ভব। যার জন্য খুব বেশি বাজেটের প্রয়োজন পড়বেনা এবং জাতীয় গ্রিডের সম্প্রসারনের প্রয়োজন নেই। তাই বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থায় সরকারকে আরো বেশী মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। হাসান কামরুল, জ্বালানি ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক।
ক্যাটাগরি: মতামত
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দরপতনের নেপথ্যে
জানুয়ারি ০৫, ২০১৬ মঙ্গলবার ০৯:৪০ পিএম - আব্দুল্লাহ আল মামুন
২০১৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য দ্রুত কমছে। তেলের এই দরপতন বিশ্বের তেল উৎপাদনকারী দেশে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। এই ক’দিনে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন তেল কোম্পানিতে কর্মরত প্রায় ২ লাখের বেশি জনশক্তি চাকরি হারিয়েছে। ২০০৮ সালের জুলাইতে তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি সর্বোচ্চ ১৪৫ ডলার ছুঁয়ে যায়। এমনকি ২০১১ সালেও তেলের মূল্য ১০০ ডলারে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু সেটা এখন ৩৭ ডলারে এসে ঠেকেছে। এমনকি তেলের মূল্য সর্বনিম্ন কুড়ি ডলারেও নেমে আসতে পারে বলে অনেকে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। তেলের দরপতনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশসমূহ। শুধু তাই নয়, তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোতে জনশক্তি রপ্তানিকারক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অর্থনীতির সমীকরণ মতে বিশ্বজুড়ে তেল উৎপাদন যে পরিমাণ বেড়েছে সেইহারে চাহিদা বাড়েনি, তাই তেলের দাম কমে গেছে।  বিশ্বের অন্যতম তেল আমদানিকারক দেশ খোদ আমেরিকাই গত ছয় বছরে তেল উৎপাদন করেছে দ্বিগুণ। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমেরিকা শেল পাথরের খোঁজে সঞ্চিত “কেরোজেন” নামক জৈব দাহ্য পদার্থ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন করছে। যাকে বলা হয় “শেল ওয়েল”। ফলে সৌদি আরব, নাইজেরিয়ার মতো দেশ থেকে আমেরিকার তেল আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায় এসে পৌঁছেছে। এদিকে কানাডা, রাশিয়া এবং গৃহযুদ্ধের মুখে থাকা ইরাক ও লিবিয়াও তেল উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে।   পরাশক্তিগুলোর সাথে পারমাণবিক চুক্তি করার পর ইরানের পাইপলাইন থেকে খুব সহসা বাজারে তেল আসতে শুরু করবে। ফলে জ্বালানি তেলে বলতে গেলে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে বাজার। তেলের জোগান বাড়লেও ইউরোপ এবং বিশেষ করে চীনের অর্থনৈতিক মন্দা, নবায়নযোগ্য ও বিকল্প জ্বালানির প্রসার, জ্বালানি সাশ্রয়ী হাইব্রিড গাড়ির প্রচলন ইত্যাদি তেলের চাহিদা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। অনেকে আবার বলছেন, ইসলামিক ষ্টেট যেহারে চোরাই পথে ইরাক ও সিরিয়ার খনি থেকে কম মূল্যে তেল বিক্রি করছে, সেটাও তেলের দরপতনের অন্যতম কারণ। তেলের মূল্য স্থিতিশীল করায় তেলের উৎপাদন কমাতে নারাজ ওপেকের হেভিওয়েট সদস্য দেশ সৌদি আরব। সৌদি যুক্তি দিচ্ছে এখন উৎপাদন কমালে প্রতিযোগী দেশগুলোর তারা কাছে মার্কেট শেয়ার হারাবে। তেল গবেষকদের মতে, তেলের দাম ৬০ ডলারের নিচে হলে আমেরিকার শেল তেল উৎপাদন লাভজনক হবে না। তাই সৌদি আরব তেলের দাম কমিয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসতে চায় যাতে আমেরিকা শেল তেল উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয় এবং সৌদি আরব আমেরিকার তেলের আবার বাজার ফিরে পায়। কিন্তু এজন্য সৌদি আরবকে চরম মূল্যও দিতে হচ্ছে। সৌদি আরবসহ আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এ বছরেই তেলের আয় থেকে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে। তবে তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করার নেপথ্যে অর্থনীতির জোগান-চাহিদার সমীকরণের বাইরে বিশ্বরাজনীতির মারপেঁচও কাজ করছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তেলকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা নতুন কিছু নয়। সত্তর দশকে, আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর ইসরাইলকে সমর্থন করার জন্য আমেরিকা ও ইসরাইলের সহযোগী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ওপেক তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সম্প্রতি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সমর্থন করার জন্য ইরান ও রাশিয়াকে শায়েস্তা করতে চায় আমেরিকা।   তাই বলা হচ্ছে, ইরান ও রাশিয়াকে শাস্তি দেয়ার জন্যই আমেরিকা ও সৌদি আরব একজোট হয়ে তেলের দাম কমাচ্ছে। যেমনটা হয়েছিল আশির দশকে। তেলের দরপতন সেই সময়কার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ত্বরান্বিত করে। রাশিয়ার রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তেল থেকে। অন্যদিকে ইরানের তেল উৎপাদনের খরচ ১০০ ডলারেরও বেশি। তাই তেলের দাম লম্বা সময় ধরে কম থাকলে বিপাকে পড়বে ওই দু’টো দেশ। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ তেলের আয়ের উপর নির্ভরশীল সেগুলো হচ্ছে  কুয়েত, কাতার, ইরাক, ওমান, লিবিয়া এবং সৌদি আরব। তেলের মূল্য ৫০ ডলারের বেশি থাকবে এমনটা ধরেই এসব দেশে বাজেট করা হয়। কিন্তু তেলের দাম নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়াতে এসব দেশ এখন বাজেট ঘাটতিতে পড়তে যাচ্ছে। যেমন কাতার গত ১৫ বছরের মধ্যে এই প্রথম প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে কেউ দেশ-বিদেশের প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ ঋণ করার কথাও ভাবছে। বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে তেল উৎপাদনকারী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ছড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশি। যাদের পাঠানো রেমিটেন্স দিয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অর্থনীতি। তেলের দরপতনের কারণে ইতোমধ্যে তেল সমৃদ্ধ আরব দেশে বড় বড় কন্সট্রাকশন প্রজেক্টের রাশ টেনে ধরা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচুর প্রবাসী বাংলাদেশির চাকরি এখন হুমকির মুখে। বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানীগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে প্রবাসী কর্মী ছাঁটাই করছে। সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোতেও ছাঁটাই চলছে। সম্প্রতি কুয়েতে সরকারি অফিসে পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রবাসী কর্মচারীদের চাকরিতে আর রাখা হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কুয়েত সরকার। কুয়েতের এই সিদ্ধান্ত গাল্ফ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকেও প্রভাবিত করবে কিনা সে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা ভেবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখন বেশ উদ্বিগ্ন। জ্বালানি তেলের দরের উত্থান-পতন নতুন কিছু নয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে তেলের মূল্য ৩০ ডলারে নেমে আসলেও দু’বছরের মাথায় আবার ১০০ ডলারে উঠে আসে। শেষজ্ঞদের মতে তেলের মূল্য বছরখানেকের মধ্যে আবারো শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসবে। লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন, সিডনি প্রবাসী প্রকৌশলী। সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক।  
ক্যাটাগরি: মতামত
‘আমদানির চ্যালেঞ্জ নিয়েই জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রায় পা দিতে হবে’
জানুয়ারি ০২, ২০১৬ শনিবার ০১:৩৬ পিএম - বদরূল ইমাম
বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এক বিরাট পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন নিজস্ব গ্যাসের উপর ভর করে সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহারে অভ্যস্ত বাংলাদেশ এখন এক কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন। অদূর ভবিষ্যতে গ্যাসের মজুদ শেষ হয়ে যাবার সম্ভাবনা নীতি নির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে বিকল্প জ্বালানী কি হবে সে চিন্তায়। আগের কোন সরকারই এরকম একটি সময়ের জন্য দেশকে প্রস্তুত করার কোন উদ্যোগ নেয়নি। তাই হঠাৎ করেই দেশ ধরা পড়েছে এক জ্বালানি সংকটের পাকে। নীতি নির্ধারণী মহল ভবিষ্যতে দেশের নিজস্ব জ্বালানির উপর ভর করার উপায় বের করতে না পেরে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিদেশ থেকে আমদানিকৃত জ্বালানিকেই একমাত্র উপায় মনে করছেন। আগামী দিনের সরকারি পরিকল্পনায় তা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, ২০১০ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেখানে বিদেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানির উপর নির্ভরতা ছিল ১০ শতাংশের কম, ২০৩০ সালে আমদানি করা জ্বালানির উপর নির্ভরতা বেড়ে তা হবে ৭০ শতাংশ। আর এ জ্বালানি হিসাবে বিদেশ থেকে আসবে বিপুল পরিমাণ কয়লা, ব্যয়বহুল জ্বালানি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), জ্বালানি তেল এবং আর আসবে  ইউরেনিয়াম। এটি সামাল দিতে বাংলাদেশকে বিরাট অংকের অর্থেরও জোগান দিতে হবে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ জ্বালানি (মূলত গ্যাস, কয়লা ও আমদানিকৃত জ্বালানি তেল) ব্যবহ্রত হয়, তার অর্থমূল্য প্রতি বছর প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার (ষোল হাজার কোটি টাকা)। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবার কথা, তার জন্য জ্বালানির (মূলত আমদানিকৃত কয়লা, তেল, এলএনজি এবং গ্যাস) খরচ বেড়ে দাঁড়াবে বর্তমান অর্থ মূল্যে  প্রতি বছর ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার। দেশের বর্তমান অবশিষ্ট গ্যাস মজুদ (প্রমাণিত ও সম্ভাব্য) ১৪.০৮৮ টিসিএফ । সরকারি ও পরামর্শক সংস্থার সূত্র মতে গ্যাসের উৎপাদন হার ২০১৭ সালের পর থেকে কমতে থাকবে ও জ্বালানি হিসাবে গ্যাস তার প্রাধান্য হারিয়ে ক্রমান্বয়ে স্বল্প থেকে স্বল্পতর  ভূমিকা রাখবে। ২০২৫ সালে বর্তমান গ্যাস নিঃশেষ হবে না বটে তবে তা স্বল্প ও নগন্য হারে ২০৩০ সাল বা তারপরও কিছু সময় পর্যন্ত সরবরাহ হবে। দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার না হলে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব যে গ্যাসের উপর ভর করে অর্থনীতিকে আয়াশের সাথে এগিয়ে নিয়ে এসেছে তার পরিসমাপ্তি ঘটবে। উদ্বেগের বিষয় এটিই যে, গ্যাসের বিকল্প অন্য জ্বালানি ব্যবহার করতে ব্যয় হবে বেশী দামে।একারণে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি ব্যবহারে অভ্যস্ত বাংলাদেশকে কঠিন আর্থিক চ্যালেঞ্জও সামলাতে হবে। সরকারি পরিকল্পনায় ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হযেছে যার ৫০ শতাংশ উৎপাদিত হবে কয়লা দিয়ে। এই ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রতি বছর প্রয়োজন হবে ৬০ মিলিয়ন টন কয়লা। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি বছর ১ মিলিয়ন টন কয়লা উৎপাদিত হয় দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া ভূগর্ভস্থ খনি থেকে। দেশে আরো তিনটি কয়লাক্ষেত্র থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে একই হারে কয়লা উৎপাদন করা যেতে পারে। উম্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে এর চেয়ে বেশী কয়লা আহরণ সম্ভব হলেও এটির প্রতি সরকারের অনাগ্রহ সুস্পষ্ট। যদি ধরে নেওয়া হয় মোট চারটি কয়লা খনিই ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে চালু করা হলো তাতে বছরে ৪ মিলিয়ন টন কয়লা পাওয়া সম্ভব। ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করে উৎপাদন হার কিছু বাড়ানো যেতে পারে বটে তাতে করে বছরে সর্বোচ্চ মোট ৮ মিলিয়ন টন কয়লা পাওয়া যেতে পারে। ২০৩০ সালে প্রয়োজনীয় বাকি ৫২ মিলিয়ন টন কয়লা আনতে হবে বিদেশ থেকে আমদানি প্রক্রিয়ায়।  তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসাবে সমাদৃত এবং দীর্ঘ মেয়াদী সরবরাহ পেতে বিশ্ব বাজার থেকে তা জোগান নেওয়ার ব্যবস্থা করা সহজতর  হবে। তবে এই জ্বালানি অতি ব্যয়বহুল। বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করার জন্য কাতারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে যাচ্ছে। এ জন্য বর্তমানে সমুদ্রে ভাসমান টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। পরবর্তীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে আমদানির পরিমাণ প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট হবে । এলএনজি তরল অবস্থায় পরিবহন করা হয় ও গন্তব্যে পৌঁছে তা পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশের গ্যাস অদূর ভবিষ্যতে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এলএনজি আমদানির মাধ্যমে তা পূরণের লক্ষ্য থেকেই এ উদ্যোগ। ২০১৭ সাল থেকে এলএনজি ব্যবহার শুরু করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।   বাংলাদেশে আর্থিক বিচারে সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যৃৎ কেন্দ্র  যার নির্মাণ  ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার (পদ্মা সেতুর নির্মাণ খরচ চার বিলিয়ন ডলারের কম)। নির্মাণ খরচ বেশি হলেও এতে ব্যবহ্রত জ্বালানি ইউরেনিয়ামের আমদানিকৃত মূল্য কত হবে সে বিষয়ে কোন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কেবল জ্বালানিই আমদানিকৃত হবে না বরং পুরো প্রকল্পটি দীর্ঘদিন সম্পূর্ণভাবে বিদেশি নির্ভর থাকবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটিয়ে দেশের  জ্বালানি সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে অনেকেই  আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গ্রীড বিদ্যুৎ নেই এরকম বহু স্থানে বিদ্যুৎ বঞ্চিত মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ  এনে দিয়ে সৌর বিদ্যুৎ এক নিরব বিপ্লব ঘটিয়েছে বটে, কিন্তু দেশে অদূর ভবিষ্যতে বিদ্যুতের সামগ্রিক উৎপাদনের হিসাবে  সৌরবিদ্যুৎ বা বায়ু বিদ্যুৎ বা জলবিদ্যুৎ বৃহৎ পরিমাণে ভাগ বসাতে পারবে বলে মনে হয় না। বর্তমানে সৌর ও বায়ু শক্তির সাহায্যে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ক্ষমতার পরিমান ১৭৫ মেগাওয়াট এবং জলবিদ্যুৎ ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট, যা কিনা সম্মিলিতভাবে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার (১১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট) মাত্র ৩.৫ শতাংশ।  সরকার ২০২০ সাল নাগাদ এই মাত্রাকে ১০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান আগামী ২০ বছর  অল্পই থেকে যাবে।   বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সমস্যা মোকাবিলার উদ্যোগ নিচ্ছে। ভারত, ভূটান ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে বাংলাদেশ তার ভবিষ্যত বিদ্যুৎ চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ জোগান দিতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের এই তিনটি প্রতিবেশী দেশ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনাময় দেশ। ভারত ইতিমধ্যেই ভূটান ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে এই সম্ভাবনাকে তার বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর অংশ হিসাবে কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে তার বিদ্যুৎ সমস্যার  আংশিক সমাধান করার পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশকে বর্তমানে আন্তদেশীয় গ্যাস সরবরাহ সম্ভাবনার দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। বর্তমানে পরিকল্পনাধীন  তুর্কিমেনস্তান-আফগানিস্থান-পাকিস্তান-ভারত (তাপি) গ্যাস পাইপ লাইন প্রকল্পে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সে গ্যাস বাংলাদেশ পর্যন্ত আনার ব্যবস্থা করতে হলে বাংলাদেশকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়াও অপর নির্মাণাধীন আন্তদেশীয় গ্যাস পাইপ লাইনে (ইরান-পাকিস্থান-ভারত বা ইপি) যুক্ত হওয়া যায় কিনা তাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব গ্যাসের  মূল্য কত হবে তা একটি বিবেচ্য বিষয় বটে। উপরোক্ত আলোচনা থেকে সামগ্রিকভাবে একটি বিষয় উঠে আসে। তা হলো বাংলাদেশকে তার জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রায় পা দিতে হবে। আর এর  জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে প্রথমত  আমদানী করা জ্বালানির এই বিশাল বহরের ব্যয়ভার বহন করা এবং দ্বিতীয়ত এর তদারকি করার জন্য যোগ্য লোকবল গড়ে তোলা।   লেখক: ড. বদরূল ইমাম, অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।  
ক্যাটাগরি: মতামত
সৌরচালিত সেচ পাম্পের নতুন সম্ভাবনা
নভেম্বর ২৩, ২০১৫ সোমবার ০৯:০৭ এএম - ড. মুশফিকুর রহমান
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’(স্রেডা) গঠন করেছে। স্রেডা ২০২০ সালের মধ্যে সারা দেশে পাঁচ লাখ ‘সোলার পাম্প’স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সরকার দেশে গ্রিড বিদ্যুতের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং কৃষিতে সেচের জন্য বিদ্যুৎশক্তি ও ডিজেলচালিত প্রায় ১৭ লাখ পাম্প পর্যায়ক্রমে সোলার পাম্প দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চায়। ইতিমধ্যে সারা দেশে ২০০-এর বেশি সৌরশক্তিচালিত সেচপাম্প বা সোলার পাম্প স্থাপিত হয়েছে। কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামে স্থাপিত হয়েছে তেমনি তিনটি সোলার পাম্প। মাঠে মাঠে ধানের খেতগুলো অপেক্ষায় আছে কৃষক শিগগিরই ফসল তুলবে, নবান্নের আয়োজনে মেতে উঠবে। সোলার পাম্প কেমন চলছে দেখতে সম্প্রতি তা্ই পোড়াদহের তেঘরিয়া গ্রাম ঘুরে এলাম। দেশে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসা চাষযোগ্য কৃষিজমিতে এখন উদ্বৃত্ত ফসল ফলে। এ ক্ষেত্রে কৃষিপ্রযুক্তির বিকাশ ও তার ব্যবহার, সেচের আওতায় বর্ধিত কৃষিজমির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এখানকার মাঠে ফসলের খেতে সেচের পানি পেতে গতানুগতিক ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ-চালিত নলকূপ ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থাপিত সোলার পাম্প তিনটির প্রতিটি ১৩ কিলোওয়াট বিদ্যুৎশক্তির পাম্প। সারা দিনে প্রতিটি পাম্প প্রায় ১৫০-১৮০ লাখ লিটার পানি ভূগর্ভের ২৪০ ফুট গভীরে অবস্থিত জলস্তর থেকে টেনে তুলছে। প্রতিটি পাম্পের উত্তোলিত পানি ১২৫ বিঘা জমিতে সরবরাহ করছে সারা দিন বিরতিহীন। সূর্য অস্ত গেলে পাম্পও বন্ধ থাকে, কেননা সোলার পাম্পের সঙ্গে স্থাপিত সোলার প্যানেলগুলো সূর্যের আলোতে সরাসরি বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করে পাম্প চালায়। প্রতিটি পাম্পের সঙ্গে স্থাপিত প্যানেল ১৯.২ কিলোওয়াট বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনে সক্ষম। সূর্যের আলো ছাড়া এখানে কোনো জ্বালানি যেমন দরকার নেই, তেমনি পাম্প চালু করে দিয়ে এর পাশে কারও বসে থাকারও দরকার নেই। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে গ্রিড এলাকার বাইরে ‘সোলার হোম সিস্টেমস’ স্থাপনে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। ২০০৩ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত স্থাপিত প্রায় ৪০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমস দেশের শহর, গ্রাম, দোকান, কুটিরশিল্পে, নৌকায় রাতের আঁধার সরিয়ে বিদ্যুতের আলো ছড়াচ্ছে। গ্রিড বিদ্যুৎ যেখানে যায়নি, সেখানে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন সচল রাখার শক্তি জোগান দিচ্ছে। এককভাবে সামান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সঞ্চয়ে রেখে তা দীর্ঘ সময় ব্যবহারের ব্যবস্থা হলেও সম্মিলিতভাবে স্থাপিত সোলার হোম সিস্টেমস দেশে প্রায় ১৪৫ মেগাওয়াট পরিমাণ বিদ্যুতের জোগান দিচ্ছে। ২০১৭ সাল নাগাদ দেশে ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমস স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তেঘরিয়া গ্রামে স্থাপিত সোলার পাম্পের চেয়ে বড় বা ছোট সোলার পাম্পও দেশের বিভিন্ন স্থানে বসেছে। পাম্পের পানি উত্তোলন ক্ষমতা অনুযায়ী তার সেচসুবিধা দেওয়ার ক্ষমতা নির্ধারিত হয়। এখানকার মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে ‘ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশনে’র চেয়ারম্যান দীপাল বড়ুয়া বললেন, সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সেচের পাম্প চালানো, উত্তোলিত পানি ভূগর্ভস্থ নালা দিয়ে জমিতে পৌঁছে দেওয়ার আয়োজন সম্পন্ন করতে প্রায় ১০ শতক জায়গা দরকার হয়। ১২৫ বিঘা জমিতে সোলার পাম্প দিয়ে সেচ দেওয়ার জন্য এখন অবধি এককালীন প্রায় ৪৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ দরকার। ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশনের এই সোলার পাম্প স্থাপনে আর্থিক সহায়তা করেছে সরকারের প্রতিষ্ঠান ‘ইডকল’। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই বিনিয়োগ কয়েক বছরেই তুলে আনা সম্ভব। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফসলের জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য প্রায় ১৭ লাখ পাম্প স্থাপিত হয়েছে, যার মধ্যে ৮৩ শতাংশ ডিজেলচালিত পাম্প এবং অবশিষ্ট ১৭ শতাংশ বিদ্যুৎ-চালিত পাম্প। সেচ মৌসুমে সেচের পাম্প চালু রাখতে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পরিমাণ বিদ্যুৎ ও প্রায় ৯ লাখ টন জ্বালানি ডিজেল প্রয়োজন হয়। প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার দেশে সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুতের জোগান দেওয়া তাই বড় চ্যালেঞ্জ। অপরদিকে, জীবাশ্ম জ্বালানি ডিজেল পুড়িয়ে বিপুলসংখ্যক অগভীর নলকূপ চালানোর ফলে ক্রমাগত ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড উদ্গীরিত হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশছে। সোলার পাম্প স্থাপনের মাধ্যমে ব্যয়বহুল ডিজেল ও ব্যাপক চাহিদার ‘গ্রিড বিদ্যুৎ’ সাশ্রয় এবং পরিবেশ রক্ষা উভয়ই সম্ভব। এলাকার কৃষকও সোলার পাম্প নিয়ে বেশ উজ্জীবিত। নতুন এই প্রযুক্তির দিকে শুরুতে খানিক বিস্ময়ে-সংশয়ে তাকালেও এখন প্রকৃতির উদার হাতে বিলিয়ে দেওয়া সূর্যের আলোর মতোই অনায়াসে ফসলের জমিতে সেচের পানি গড়িয়ে আসতে দেখে ভালোই লাগছে এখানকার কৃষক, চাষিদের। কেবল ধান নয়, কৃষক সেচের পানি ব্যবহার করছেন কলার বাগানে।পরিকল্পনা করছেন, সহজেই যখন সেচের পানি মিলছে, ধান কাটা হয়ে গেলে রবিশস্যের চাষে মনোযোগ দেবেন। তবে, কৃষকের আশা ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে সেচের চেয়ে এখন চাষবাসে খরচ কম হবে। সোলার পাম্প কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ স্থাপন করা গেলে সেচের জন্য স্থাপিত দেশের প্রায় ১৩ লাখ ডিজেল পাম্প পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে। সোলার পাম্প স্থাপনে সম্পৃক্ত এনজিও এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌক্তিক দাবি, সেচ মৌসুমের পর সোলার পাম্পের সঙ্গে বসানো সোলার প্যানেল যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, তা যেন যৌক্তিক মূল্যে গ্রিডে সরবরাহ করার সুযোগ দেওয়া হয়। তা ছাড়া, যেখানে গ্রিড সংযোগ জটিল, সোলার পাম্পের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সেখানকার ধানমাড়াই, কুটিরশিল্পে ব্যবহারের উপায় নিয়ে ভাবা হচ্ছে, উদ্যোগগুলো সফল হলে আগামী কয়েক বছরে সারা দেশে সোলার পাম্প গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে সামনে আসবে। ড. মুশফিকুর রহমান, খনি প্রকৌশলী। জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক। সূত্র: প্রথম আলো
ক্যাটাগরি: মতামত
    সাম্প্রতিক মতামত
সৌরচালিত সেচ পাম্পের নতুন সম্ভাবনা
    FOLLOW US ON FACEBOOK


Explore the energynewsbd.com
হোম
এনার্জি ওয়ার্ল্ড
মতামত
পরিবেশ
অন্যান্য
এনার্জি বিডি
গ্রীণ এনার্জি
সাক্ষাৎকার
বিজনেস
আর্কাইভ
About Us Contact Us Terms & Conditions Privacy Policy Advertisement Policy

   Editor & Publisher: Aminur Rahman
   Copyright @ 2015-2018 energynewsbd.com
   All Rights Reserved | Developed By: Jadukor IT